তেল দিয়ে স্বর্ণকে প্রতিষ্ঠাপন ও সৌদির মুনাফিকী (আমেরিকান সাম্রাজ্যের গোপন ইতিহাস) . ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে সাড়া দিতে গিয়ে মিশর ও সিরিয়া যুগপৎভাবে ইসরাইলের উপর ১৯৭৩ সালের ৬ই অক্টোবরে আক্রমণ করে বসে। দিনটি ছিল 'ইয়োম কিপুর' তথা ইয়াহুদিদের পবিত্রতম ধর্মীয় ছুটির দিন। রণকৌশলগত দিক বিচারে নিজে নড়বড়ে অবস্থায় আছে এটা পুরোপুরি জেনেও মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সালকে চাপ দিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটু ভিন্নতরভাবে আঘাত হানার- যেটাকে আনোয়ার সাদাত নিজেই উল্লেখ করেন "তেল অস্ত্র" হিসেবে। অক্টোবরের ১৬ তারিখে সৌদি আরব এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্ছলের অন্য চারটি আরবদেশ ঘোষণা দিলো তেলের দাম ৭০% বাড়িয়ে দেয়ার। ইরানও ইসলামিক সংহতি প্রকাশে এই উদ্যোগে যোগ দিল। . সৌদি তেলের বিক্রয় মূল্য লাফিয়ে উঠলো নতুন রেকর্ড মার্কে; ১৯৭৪ সালের পহেলা জানুয়ারিতে তা আকাশমুখী হয়ে উঠলো। মিডিয়া সতর্কবাণী উচ্চারিত করে জানান দিলো যে, এই ধাক্কায় মার্কিন অর্থনীতি পতনের দ্বারপ্রান্তে উপনিত হয়েছে। সারাদেশের গ্যাসস্টেশনের সামনে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর যানবাহনের লাইন দাঁড়িয়ে গেল; অপরদিকে, অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করলেন হয়তোবা ১৯২৯ সালের মত আরেকটি মহামন্দা দেখা দিতে পারে। . মার্কিন সরকার খুব ততপর হয়ে উঠে, তারা আমাদের দুই লেভেল বিশিষ্ট এসাইনমেন্ট দিল। প্রথম হল, এমন একটি কলাকৌশল উদ্ভাবন করা যাতে করে তেলের জন্য আমরা যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ওপেককে দিই সেটার পুরো অর্থই যেন ওপেক রাষ্ট্রগুলো মার্কিন কোম্পানির কাছে প্রবাহিত করে ফেলে। (অর্থাৎ তেল থেকে আয় করা আরবদের টাকা যেন ফিরে আবার যুক্তরাস্ট্রের কাছেই চলে আসে)। দ্বিতীয় কাজটি ছিল একটি নতুন "তেল মানদণ্ড" প্রতিষ্ঠিত করা যা "স্বর্ণ মানদণ্ড" -কে প্রতিস্থাপিত করবে। (এটা হল স্বর্ণ সড়িয়ে তেলকে নতুন স্বর্ণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। হাদিসে বর্ণিত স্বর্ণের পাহাড়)। আমরা ইকোনোমিক হিটম্যানরা জানতাম, এ ধরনের যেকোনো পরিকল্পনার মূল চাবিকাঠি হল সৌদি আরব, কারণ তার দখলে রয়েছে সবচেয়ে বেশি তেল সম্পদ। . আমরা সৌদিকে লোভের ফাঁদে আটকাতে সক্ষম হলাম। তারা আমাদের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত মানতে রাজী হল। শর্ত গুলো ছিল- ১) সৌদি আরব তার তেল বিক্রি করে অর্জিত পেট্রে ডলারের বড় অংশ আমেরিকার সরকারী সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করবে। (এভাবে আমেরিকার ডলার আবার আমেরিকার কাছেই ফিরে আসবে) ২) সৌদি আরব এই বিনিয়োগকরা অর্থ থেকে প্রাপ্ত বিলিয়ন বিলিয়ন সুদ (নিজে না নিয়ে) অন্যান্য মার্কিন কোম্পানিকে ভাড়া করবে, যাতে করে ওই কোম্পানি গুলো সৌদি আরবকে পশ্চিমা ধাঁচে মডার্নাইজ করে গড়ে তুলবে। (ডলার আমেরিকার কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত সুদও আবার অন্য আমেরিকা কোম্পানিকে দেয়া হবে বিনিময়ে তারা সৌদিকে পশ্চিমাদের মত করে সাজাবে)। ৩) তেলের দাম আমেরিকার কাছে গ্রহণযোগ্য হয় এমন একটি সীমার মধ্যে বেঁধে রাখতে হবে। এরফলে, নিজের পক্ষ থেকে আমেরিকা সরকার এই প্রতিশ্রুতি দিলো যে, 'সে সৌদি রাজপরিবারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখবে'। . এছাড়াও বাড়তি আরোও একটি বোঝাপড়া হলো, যা মিডিয়ার খুব একটা নজর না কাড়লেও কর্পোরেটোক্রাসির প্রয়োজনের দিকবিচারে সেটা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হলো বৈশ্বিক মুদ্রার মানদণ্ড হিসেবে ডলারকে বজায় রাখা। সৌদি আরব অঙ্গীকার করলো সে তেল ব্যবসাটি চালাবে একমাত্র মার্কিন ডলারের মাধ্যমেই। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে কলমের এক আঁচড়েই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল ডলারের সার্বভৌমত্ব। তেল প্রতিস্থাপিত করলো স্বর্ণকে। এতে করে যেকোনো মুদ্রার মূল্যের পরিমাপ এখন থেকে ডলার দিয়ে নির্ধারণ হবে। . . -The Secret History of the American Empire Book by John Perkins (আমেরিকান সাম্রাজ্যের গোপন ইতিহাস) — reading The Secret History of the American Empire. © _ফেরদৌস আজম

Comments

Popular posts from this blog

মঙ্গল শব্দের অর্থ কি ?

অ্যান্ড্রয়েড ফোনে এয়ারপ্লেন মোড সর্ম্পকে জানুন

এসো হে বৈশাখ

কেন বিচ্ছেদের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রাক্তনকে ব্লক করা উচিত ?

মূল্যমানে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ১০ মুদ্রা

জরুরী হেল্পলাইন সেবা

ভার্চুয়াল জীবনের গোধূলীবেলায়