মুখোশের বয়ান - ০২
#মুখোশের_বয়ান •••দুই••
পূর্ববর্তী অংশের ধারাবাহিকতায়...
২০০৩ সালে এসএসসি কৃতি
ছাত্র-ছাত্রী সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হচ্ছিল ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে। সরকারর একাধিক মন্ত্রী মহোদয় সহ বিশিষ্ট অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। খুব জাঁকজমক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছিল। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে শিল্পীরা আমাকে মঞ্চে আহবান করলেন, আমি মঞ্চে গেলাম। তাদের সাথে হাতে তালি দিয়ে একটি কোরাস জারী গান গাইলাম: ”দেখো নকলের আসায় শহর ছাইরা যায়... সারা বছর আড্ডা মাইরাও ফার্স্ট ডিভিশন পায়... “ সেদিনও অনেকে বিরক্ত হয়েছিলেন, দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছিলেন- তুমি সিপি, তোমার সেটা করা মানানসই হয়নি।
সাবেক রাস্ট্রপতি ডাক্তার বদরুদ্দৌজা চৌধুরী সাহেবের সাথে একদিন এক সুযোগে লম্বা গল্প হয়েছিল। জানতে চেয়েছিলাম তার বঙ্গভবনের সেই দিনগুলোর কথা।
-যখন বঙ্গভবনে সপ্তাহে একদিন তিনি রোগী দেখার ঘোষণা দিলেন তখন নাকি প্রবল আপত্তি উঠেছিলো। সরকার, যথাযথ কতৃপক্ষ, নিয়োজিত প্রটোকল সবাই বিব্রত। এ কেমন কথা! রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে রোগী দেখবেন? তিনি তখন বললেন- বঙ্গভবনে অসুবিধা হলে তাহলে আমার চেম্বারে দেখবো।
প্রটোকল বিভাগ জানালো এটাতো আরও অসম্ভব! সপ্তাহে একদিন ঢাকার রাস্তা আটকে তিনি রোগী দেখতে যাবেন-আসবেন! এতে ভোগান্তি ঝামেলা বাড়বে এবং ব্যাপক সমলোচনা হবে।
তিনি আফসোস করে বললেন- তারা বুঝতে চাইলোনা আমি শুধু একজন রাজনীতিক নই, আমি একজন চিকিৎসকও। চিকিৎসা আমার পেশা ও প্রতিশ্রুতি। একজন মানুষের একটি বড় পরিচয় থাকতে পারে কিন্তু তার সাথে অন্য পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য কী মুছে ফেলতে হবে! কে কী ভাববে বা মানুষের কী রকম ধারনা হবে সেজন্য কী নিজেকে কৃত্রিম খোলসে ঢেকে রাখতে হবে!
আজ হঠাৎ বদরুদ্দৌজা চৌধুরীর সে কথাগুলো মনে পড়লো!
আমারও একটা পরিচয় আছে। খুব বড় পরিচয়। যে পরিচয়ের সূত্রেই আমার প্রচুর বন্ধু ও শুভার্থী- আলহামদুলিল্লাহ! একজন আমাকে বললেন, সে পরিচয়ের সুবাদে অনেকে আমার লেখা না পড়েও লাইক দেন। কথাটা সত্য, আমি প্রমাণ ও পেয়েছি অনেকবার। কিন্তু আমার এই পরিচয় ও বৈশিষ্ট্যের বাইরে কী অন্যকোন পরিচয় বা বৈশিষ্ট্য থাকতে পারেনা?
আমার কর্মজীবনের শুরু হয়েছিল শিক্ষকতা দিয়ে কিন্তু পেশাগত ভাবে মিশন ভিশন চুড়ান্তভাবে সেটেল হয় মিডিয়ায়। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে ভিজ্যুয়াল মিডিয়া বা টেলিভিশনে। ইসলামিক টেলিভিশনের চাকুরী ছেড়ে আমি যখন দিগন্ত টিভিতে জয়েন করি আমার প্রথম দায়িত্ব ছিল প্রোগ্রাম বিভাগে। দিগন্ত কী ইসলামী ভাবধারার টিভি হবে না মূলধারার টিভি হবে? সেটা নিয়ে অনেক মত-দ্বিমত ছিল-— সে অনেক স্মৃতিময় কথা, অন্যসময় বলা যাবে।
দিগন্ত মূল ধারার টিভি হিসেবেই আত্মপ্রকাশক করে। নিউজ, টক-শো, গান, নাটক, সিনেমা, মিউজিকেল শো, হেলথ্ শো, কীচেন শো, লাইভ কনসার্ট সবই আছে।
দিন দিন আমার উপর দায়িত্ব বাড়তে থাকে। আমাকে প্রিভিউ কমিটির মেম্বারও বানানো হয়। প্রিভিউ কমিটির কাজ কী! ঘন্টার পর ঘন্টা বসে নাটক, মিউজিক ভিডিও, ইংলিশ ডাব করা মুভি আর বাংলা ছায়াছবি দেখা।
প্রিভিউ কমিটিতে প্রথম মুভি হিসেবে প্লেইস করা হয় অ্যালেক্স হ্যালী-র বিখ্যাত ছবি ‘দা রুটস’।
রুটস দেখতে বসে আমিতো অবাক!
এই ছবি দেখানো হবে দিগন্তে?
যিনি আমাকে ঠেলে ঠেলে এসব দায়িত্ব দিচ্ছিলেন বিনা দ্বিধায় তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। স্পষ্ট করে বললাম-
- আমি পারবো না, এসব আমার কাজ না।
তিনি বললেন, না পারলে বাদ দাও। উল্টো প্রশ্ন করলেন সব কাজ আর দায়িত্ব কী আমার? মিডিয়া করার জন্য তোমরাইতো উস্কানী দিয়েছিলে। অস্থির করে তুলেছিলে- আমাদের কোন মিডিয়া নাই কেন? এখন এসব কথা আমি শুনবো না।
তাঁর কঠোর প্রত্যুত্তরে খুব অসহায় মনেহলো নিজেকে। কণ্ঠটা নরম করে বললাম, সারাজীবন যা শিখেছি, তা’লীম দিয়েছি, যা নিষেধ করেছি- নিজে সেটা করবো! মানুষ কী বলবে!
তিনি হাহ্ হাহ্ করে কিছুক্ষণ হাসলেন। তারপর বললেন-
মানুষ কী বলবে সেটাকে খুব ভয় পাও তাইনা... ? (অসমাপ্ত - চলবে)
Comments
Post a Comment