মুখোশের বয়ান - ০৮

#মুখোশের_বয়ান_অষ্টম ……… (পূর্ববর্তী অংশের ধারাবাহিকতায়…) একে একে সবাই চলে গেল। আমি একা হয়ে গেলাম। কখনো কখনো একা হওয়া খুব কষ্টের। এই কয়দিন অনেক কথা বললাম, অনেক কথা শুনলাম। কিন্তু এখন আমার সামনে আমি। চিন্তা ও বিবেকের টানাপড়েনে নিজেই প্রশ্নকারী, নিজেই উত্তরদাতা। আনমনে নিজেকেই আমি প্রশ্ন করি- আচ্ছা মিঃ এক্স সিপি তোমার কী এ রকম একটা দায়িত্ব নেয়া ঠিক হবে? যাকে তুমি এতদিন অপসংস্কৃতি বলে প্রত্যাখ্যান করেছ, নিষিদ্ধ ইলিমেন্ট হিসেবে বিবেচনা করেছ। বক্তব্য, আলোচনা, দলিল, দস্তাবেজ দিয়ে এ থেকে বিরত থাকার জন্য জনশক্তিকে পাঠ দিয়েছো। প্রফেশনাল রেস্পন্সিবিলিটির কথা বলে তুমি এখন ‘মিউজিক শো’ ‘ড্রামা’ ‘মুভি’ এসবের প্ল্যানিং করবে! বাজেট অনুমোদন করবে! ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে এসব প্রোগ্রাম প্রিভিউ করবে! এগুলোর অফিসিয়াল রিভিউ লিখে নিজের মতামত জানাবে! অন-এয়ারের জন্য ছাড়পত্র দেবে! এ দায়িত্ব কী তোমার সাথে মানানসই? জেনে শুনে শরিয়াহর সীমালঙ্ঘন মুলক কাজে তুমি নিজেকে সম্পৃক্ত করবে? তোমার এতদিনের সম্মান, মানুষের আকাংখা, তোমার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধের কী কোন মূল্য নেই? যারা তোমাকে অনুসরণ করে, তোমাকে দেখে, তোমার কথা শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে আদর্শের পথে এসেছে তারা কী হতাশ হবেনা? এসকল অনুষ্ঠান দেখে যাদের পাপ হবে তুমি কী তার দায়ভার এড়াতে পারবে? সময় ও পরিস্থিতির প্রয়োজনে, সাংস্কৃতিক অঙ্গন কে ক্রমান্বয়ে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনার কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে এরকম একটা টিভি স্টেশন খুবই দরকারী কিন্তু তার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সক্রিয় দায়িত্বে তোমাকে থকতে হবে কেন? আপন প্রশ্নবানে কুপোকাত আমি। নিজের কাছেই তো কোন সদুত্তর নাই! আমিতো নিজেকেই কনভিন্স করতে পারছিনা, চরম অস্বস্তি আমার পুরো অন্তরকে আচ্ছন্ন করে..... । হঠাৎ পেছনে কারও হাতের স্পর্শে চমকে উঠি! একেএম হানিফ ভাই কখন যে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন টের পাইনি। পীঠে সস্নেহে চাপড় দিয়ে বললেন, - কী ভাবছো নেতা? আমার চোখ পানিতে টলমলো। তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিলাম। - না কিছু না। মিটিং এর আলোচনায় একটা এজেন্ডা বাদ পড়ে গেছে। - কী? - আমরা যারা এখানে কাজ করবো বা করছি, তাদের বিষয়ে কোন আলোচনা হয়নি। - আমাদের বিষয় নয় বলো তোমার বিষয়ে। আমাদের সারাজীবন তো আমরা মিডিয়ায় কাটিয়ে দিলাম। অনেক গালি শুনেছি। ফতোয়ার সম্মুক্ষীণ হয়েছি। সেটা আশির দশক, টিভি দেখা ঘরে টিভি রাখা ছিল হারাম। আমার এলাকার জামে মসজিদে আমাকে মুরতাদ ও ঘোষণা করা হয়েছিল বিটিভি তে চাকুরী করার কারণে। পরে ডিজি হিসেবে যখন আমার প্রমোশন হয় তখন সেই মসজিদের খতিব একদিন আমার মোহাম্মদপুরের বাসায় এসে হাজির। যেভাবে হোক বিটিভি-র ইসলামী অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে যেন তাঁর নামটা এনলিস্টেড করিয়ে দিই। এখন আমাকে মসজিদ কমিটির সভাপতি বানানোর জন্য সবাই তোড়জোড় করছে। সুতরাং এসব চিন্তা মাথা থেকে ঝেঁড়ে ফেল। কিছু প্রশ্ন এবং খটকা কাজ করতে করতে সময়ের ব্যবধানে সলভ্ হবে। - হানিফ ভাই বিষয়টা শুধু আমার সাথে রিলেইটেড নয়। আমাদের শতাধিক রিপোর্টার, প্রডিউসার, ক্যামেরাম্যান, এডিটর আছে যারা অনেকেই ইসলামী জীবন নীতি, হালাল-হারাম মেনে জীবন যাপনে অভ্যস্থ। তাদেরকেও একই রকম পরিস্থিতি ফেইস করতে হবে। হাজার হাজার ভাই বোনেরা নিজেদের রক্ত-ঘাম ঝরা অর্থের যোগান দিয়ে এই টেলিভিশন প্রতিষ্ঠা করেছেন শুধুমাত্র সওয়াবের আশায়। হানিফ ভাই আমার কথা পাত্তাই দিলেন না। হাহ্ হাহ্ করে হাসলেন। বললেন, তুমি অযথা এসব ফালতু ভাবনা ভাবছো। আমিতো মাওলানা না তবুও একটা ফতোয়া দিই শোন- তোমার এখানে পজিশন হলো ডিইডি। তুমি একটা ক্ষুদ্র টেলিভিশন চ্যানেলের তিন নম্বর ব্যক্তি। কিন্তু তোমার নেতারা ছিল মন্ত্রী, এক একটা মন্ত্রনালয়ের এক নম্বর ব্যক্তি। তাঁরা যদি একটা অনৈসলামিক সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পারে। গণতন্ত্র, সেকুলারিজম হাবিজািবি রক্ষা করার শপথ নিয়ে রাষ্ট্রের মন্ত্রী হতে পারে তুমিতো সেই রাষ্ট্রের অধীনস্থ একটা দুই ইঞ্চি জায়গার আধা ইঞ্চি কর্মকর্তা মাত্র। তুমিতো কোন শপথও নিচ্ছনা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র উন্নয়ন, এফডিসি, বিটিভি-র বাৎসরিক বজেট, দেশে যত ধরনের রবীন্দ্র, নজরুল, ফোক, আধুনিক, নৃত্যকলা আরো কত আগরম-বাগরম বাজেট আছে এগুলোর পিছনে যে শত শত কোটি টাকার সরকারী অনুদান- এগুলো মন্ত্রী পরিষদে পাশ হয়নি? এসব বাজেট পাশে উনাদের সম্মতি স্বাক্ষর লাগেনি? তাহলে উনাদের এসব কাজে অংশ নেয়া ভূমিকা রাখা কী অনৈসলামিক হয়েছে না বেশরিয়াতি হয়েছে? আমি মনেকরি উনারা কারেক্ট কাজটাই করেছেন এটাকে মুভমেন্টের কৌশলগত পার্ট হিসেবে নিয়েছেন। উনারা যদি মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব না নিতেন সেই পদগুলি কী খালি থাকতো? হয়তো সেখানে অন্য দুইটা দূর্নীতিবাজ লোক মন্ত্রী হতো। এখন যে শত্রু মিত্র সবাই স্বীকার করে তাঁদের মন্ত্রনালয় ছিল দূর্নীতিমুক্ত, তাঁরা মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব কাঁধে না নিলে সেই এচিভমেন্ট এবং এপ্রিসিয়েশন কী তোমরা পেতে? সুতরাং দৃষ্টিকে বড় কর। কোরআন, হাদীস এবং ইসলাম কে বাস্তবতার বিশ্লেষণাত্মক চোখ দিয়ে বুঝতে চেষ্টা কর। হানিফ ভাইয়ের কথাগুলো আমাকে তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা মানসিক সাপোর্ট দিলেও মনের মধ্যে আরও ভাবনার বিস্তৃতি তৈরী করে দিল । তিনি মুখে দুষ্টুমি হাসি টেনে বললেন, কী! ফতোয়া কেমন দিলাম? কৃত্রিম ভাব নিয়ে আমি সাথে সাথে বললাম আপনার এটা কোন ফতওয়া হলো! এসব গোজামিল ফতোয়ায় কাজ হবেনা। তিনি বললেন গোঁজামিল না, আমার কাছে দারুণ দারুণ ডকুমেন্টরী এভিডেন্স আছে, তোমাকে দেখাবো। - কী এভিডেন্স? উনি বললেন আপাততঃ একটা মুখে শোনাই। পরে একদিন ভিডিও ফুটেজ দেখাবো। - কী সেটা? জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশ টেলিভিশনের আর্কাইভ উদ্ভোধন উপলক্ষে জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করি আমরা। প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন, সিনিয়র মন্ত্রীরা সহ ভিভিআইপিরা সবাই আমন্ত্রিত। বুঝতেই পারছো সাজ সাজ রব। রুনা, সাবিনা, কিশোর সহ সিনিয়র শিল্পীরা এ উপলক্ষে মঞ্চে লাইভ গান গাইবেন। মজার ব্যপার হলো রুনা লায়লা যখন দেশের গান গাইছিলেন তখন দেখা গেলো অনলাইন এডিটর ক্লোজে একবার রুনা কে পরের শটে ক্লোজে তথ্যমন্ত্রীর পাশে বসা শিল্পমন্ত্রীকে ধরছে। এটা নিয়ে বিটিভি তে খুব আলোচনা হল। কেউ কেউ টিপ্পনী কেটে সেদিন আমাকে বলেছিলেন বিটিভির আজকের পারফর্মেন্স পুরোটাই হালাল! হানিফ ভাইয়ের নির্দয় রসিকতায় মনটা খুব আহত হলো। বিরক্ত প্রকাশ করে আমি বলি আচ্ছা হানিফ ভাই আপনি কী আমাকে শান্তনা দিচ্ছেন না টিটকারী করছেন। তিনি বললেন এসব শুনতে তোমার কাছে এখন বিরক্ত লাগছে। হক প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে হলে হককথা সহ্য করতে শিখতে হবে! যেদিন তুমিও আমাদের মত বিভ্রান্ত-শয়তান-গোমরাহ-মুরতাদ- পথভ্রষ্ট-এজেন্ট ইত্যাদি উপাধি পাবে সেদিন এসব ইতিহাস কাজে লাগবে। (অসমাপ্ত.... চলবে..)

Comments

Popular posts from this blog

মঙ্গল শব্দের অর্থ কি ?

অ্যান্ড্রয়েড ফোনে এয়ারপ্লেন মোড সর্ম্পকে জানুন

এসো হে বৈশাখ

কেন বিচ্ছেদের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রাক্তনকে ব্লক করা উচিত ?

মূল্যমানে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ১০ মুদ্রা

জরুরী হেল্পলাইন সেবা

ভার্চুয়াল জীবনের গোধূলীবেলায়