মুখোশের বয়ান - ১০
#মুখোশের_বয়ান_দশম _(আপাততঃ শেষ)
‘একজন এক্স সিপি’র মৃত্যু!’
আমি যে চিন্তিত তা কীভাবে অস্বীকার করি!
মনে মনে কী বলবো তা একটু গুছিয়ে নিলাম।
আপনি ঠিকই ধরেছেন আমি চিন্তিত। শুধু চিন্তিত না কিছুটা সিদ্ধান্ত হীনতার চাপে আছি। সেজন্যই আপনার কাছে এসেছি।
(মুখে হাসি টেনে) তাই নাকি! কী রকম চাপ? তাড়াতাড়ি বল আমার অন্য লোক কে সময় দেয়া আছে।
আমি সবিস্তারে গুছিয়ে তাঁকে সব বললাম। সবশেষে বললাম, আমার আপাততঃ
সংগঠনের দায়িত্ব থেকে কিছুদিনের জন্য ছুটি দরকার।
আমার কথা শেষ হলে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, এসব চিন্তা তোমার মাথায় কে ঢুকিয়েছে?
আমার সারা শরীর দিয়ে দর দর করে ঘাম ঝরছে। কণ্ঠ কেন যেন ক্রমে জড়িয়ে আসছে, আমি নিরুত্তর।
জানি কে তোমাকে এসব মন্ত্র দিয়েছে।
দিগন্ত একটা স্বতন্ত্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এটা আমাদের কোন কনসার্ন না।
তোমাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যপারে তোমরা স্বাধীন। যদি তোমরা আমাদের মত জানতে চাও, তাহলে বলবো তোমাদের এ সিদ্ধান্ত আমাদের পছন্দ হয়নাই।
দিগন্ত আমাদের কোন প্রজেক্ট না যে সেখানে দায়িত্ব পালনের জন্য
তোমাকে আমরা ছুটি দেবো। এটা তোমার চাকরী।
অন্যান্য দায়িত্বশীলরা যেভাবে চাকরী করে সংগঠন করছে, তুমিও সেভাবে করবে।
আমি ক্ষীণ স্বরে বললাম- এটাকে তো আমি চাকরী মনেকরিনা দায়িত্ব মনেকরি।
তাছাড়া এখানকার কাজের ন্যাচার সম্পূর্ণ ভিন্ন।
- ন্যাচার যে রকমই হোক, ছুটি গ্রান্টেড হবেনা।
আপনি আমার কথা গুলো একটু শুনুন, আমি আসলে খুব সমস্যায় আছি। আমি যদি ছুটি না পাই তাহলে টেলিভিশনের চাকরী ছেড়ে দেব।
- কেন? বিষয়টা নিয়ে তুমি এত সিরিয়াস কেন?
- আপনি বুঝতে পারছেন, আমাকে নাটক, গান-বাজনা, সিনেমা, এসব কিছু হ্যান্ডেল করতে হবে।পরিকল্পনা পাশ, বাজেট অনুমোদন, প্রিভিউ, রিভিউ, অন-এয়ার সব।
-খুব ভালো হইছে। তোমাদের মাথায় ঢুকছে তোমরা মেইনস্ট্রিম টিভি করবা,
ইসলামিক টিভি করবা না। সমস্যা তো হবেই, এখন সামলাও।
আমার ব্যক্তিগত মত হলো দায়িত্ব যখন নিয়েছ এখন ছাড়া যাবেনা। তোমার বদলে ওখানে অন্য কাউকে দায়িত্ব দিলেতো আরো বরবাদ।
তুমি থাকলেতো কিছুটা কন্ট্রোল থাকবে।
- সেজন্যই তো বলেছি আমাকে একটু কিছু দিনের জন্য রুখসুদ দেন।
- নো, আমরা ভাবছিলাম তোমার দায়িত্ব আরও বাড়াবো উল্টা তুমি চাচ্ছো ছুটি।
কয়দিন পরে আমার বিরুদ্ধে যখন কমপ্লেইন আসবে তখন কী করবেন? তখন তো সোজা এক্সপেল্ড করে দেবেন।
- কমপ্লেন কেন আসবে? কমপ্লেন আসার মত কাজ করবা না, তাইলেই তো হলো।
শোন তুমি যদি সহীহ থাক তোমার নিয়ত যদি সহীহ থাকে কোন সমস্যা নাই।
আমাদের স্মৃতিসৌধে যাওয়া নিয়ে কত সমলোচনা হলো। আরে আমরাতো রাষ্ট্রীয়
প্রটোকলের জন্য সেখানে গেলাম।
আমরা কী সেখানে পুজা করতে গেছি! আমি মন্ত্রী থাকতে পুজা মন্ডপে বরাদ্দ দিতে হইছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষার জন্য মন্ডপ পরিদর্শনে গেছি।
এসব নিয়ে কত অপপ্রচার হইছে। কিন্তু আখেরে আল্লাহর রহমতে প্রমাণ হইছে আমরা দেশ-জাতির জন্যই কাজ করছি। ঐসব অপপ্রচার ধোপে টিকে নাই। বেগম জিয়ার সাথে জোটবদ্ধ আন্দোলন করায় আমাদের কত কুৎসিৎ ভাষায় সমলোচনা করা হইছে। এখন হক্কানী বড় বড় আলেম পীর মাশায়েখরাও স্বীকার করছেন দেশ এবং ইসলাম রক্ষার স্বার্থেই বৃহত্তর ঐক্যের দরকার।
তাঁরাও এখন বেগম সাহেবের সাথে মিটিং করেন।
- কিন্তু আমার তো ভয় করছে।
আল্লাহ কে ভয় কর। নিজে নিজের কাছে পরিস্কার থাক। তোমরা বলছো তোমরা
নতুন ধারা সৃষ্টি করবা। শালীন, সত্য সুন্দরের পক্ষে টেলিভিশন করবা।
যদি ভালো কিছু করে দেখাতে পারো তবে সবাই তোমাদের বাহবা দিবে, স্বাগত জানাবে। ত্রুটি বিচ্চুতি কিছু হইলে ভুলে যাবে। আর যদি ফেইল কর কথা দিয়া কথা না রাখতে পার সম্মান এবং ইজ্জত সবটাই যাবে।
আমি অসহায়ের মত হাত পা ছড়িয়ে বসে তাঁর কথা শুনছিলাম।
- সূরা নছর এর তফসীর পড় নাই? সেখানে কী বলছে- বিজয় আসলে সেখানে এস্তেগফারের কথা কেন বলছে?
যুদ্ধের সময় টুকটাক ভুল হতে পারে বাড়াবাড়ি হতে পারে। সেসব কাজের জন্য ক্ষমা চাইতে বলা হইছে।
দিগন্ত আমাদের না এটা একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এই কথা বলে কী পার পাওয়া যাবে? আমাদের লোকেরাই তো এখানে বড় পরিমাণ টাকা ইনভেস্ট করছে।
ছাত্র আন্দোলনের প্রথম সভাপতি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য
এটার চেয়ারম্যান। আমার কথা না হয় বাদই দিলাম।
আমরাতো সাংগঠনিক ভাবে কাউকে ইনভেস্ট করতে বলি নাই। লোকেরা আমাদের কে জিজ্ঞেস করেও ইনভেস্ট করেনাই।
আর নির্বাহী কমিটির সদস্যের পরিচালিত নিজস্ব ব্যবসার ব্যপারে কোন আপত্তি আসলে আমরা তখন সেটা সাংগঠনিক ভাবে দেখবো।
তাহলে আমার এখন করণীয় কী?
সেটা তুমি ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে নির্ধারণ কর। দায়িত্ব থেকে ছুটি নেয়ার চিন্তা
মাথা থেকে ফেলে দাও। তোমার সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে, ফি আমানিল্লাহ। আমার কথা শেষ।
আমার কলিজাটা হুঁ হুঁ করে উঠলো। বুক ভেঙ্গে দুমড়ে মুচড়ে উঠছে কষ্টে।
দায়িত্বশীলদের একজনের কাছে গিয়ে মনেহয় তাঁরটা ঠিক আরেকজনের কাছে গিয়ে মনেহয় না তিনি যা বলছেন এটাই ঠিক।
হে আল্লাহ তুমি কেন আমাদের এত ছোট করে দুনিয়ায় পাঠালে।
দায়িত্বশীলরা আমাদের এত ভালোবাসে। কোথায় আমাদের মা-বাবা!
কোথায় আমাদের পরিবার পরিজন!
নিজের জীবনের সিদ্ধান্তের জন্য আমরাতো মা-বাবার কাছে যাই নি কখনো!
যখন মাত্র এসএসসি পাশ করে শপথ নিয়েছি, কুমিল্লা থেকে সোজা পাঠিয়ে দেয়া হলো চট্টগ্রামে। সংগঠনের সিদ্ধান্তে পলিটেকনিক ইন্সিটিউটে ইলেক্ট্রিক্যাল ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হতে হয়েছিল। নিজের কোন চিন্তা করার সুযোগ ছিলনা। নিজকে নিয়ে চিন্তা করার দায়িত্বতো আমার না, সিদ্ধান্ত মানাটাই হলো দায়িত্ব। ছোট্ট তরুণ বয়সে কী কঠিন দায়িত্ব! সে অনেক কথা...।
পাঁচ সেমিস্টার পাশ করেও ডিপ্লোমা করা হলনা। হাত, পা, মাথা থেতলে দিয়ে একদিন ক্যাম্পাস ছাড়া করা হল। আমরা ঐতিহাসিক ৯ জন বহিষ্কার হলাম। স্থায়ীভাবে উদ্বাস্তু হয়ে যেতে হলো। ৮ জন দেশের বিভিন্ন ইনন্সিটিউটে ট্রান্সফার হয়ে পরবর্তীতে একসময় বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রীও করতে পারলো কিন্তু আমার ট্রান্সফারটাও হলোনা। ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার সাধ ঘোলের মধ্যে আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে গেল। একদিন সকালে হঠাৎ দায়িত্বশীল মোটর সাইকেলের পেছনে করে চট্টগ্রাম কলেজে নিয়ে গেলেন। শপথ পড়িয়ে দিয়ে বললেন এখন থেকে নতুন দায়িত্ব এখানে। এভাবে মোটর সাইকেলের পেছনে চড়তে চড়তে শহরের চান্দগাও থানা, এরপর একদিন জারুল গাছে ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। কত রাত, কত দিন, স্বজনহীন কত ঈদ, কত স্মৃতি। আহা সাদা কাফনে জড়িয়ে প্রিয় ভাইগুলোকে বুক ভাঙ্গা বিলাপ করতে করতে কবরে নামিয়েছি। ভাই হারা বোন কে, বার বার মূর্ছা যাওয়া মা জননীকে, বোবা বনে যাওয়া বাবাকে কে শান্তনা দিয়ে বলেছি, আমরা হৃদয়ে বিপ্লবের চাষ করেছি। বিপ্লব সফল করেই তোমাদের সন্তান কে তোমাদের কাছে ফিরিয়ে আনবো।
আমাদের নিজের কোন চিন্তা ছিলনা। আমরা পরীক্ষা দিব কী দিবনা, ফরম ফিলাপ করবো কী করবোনা সেই সিদ্ধান্তও ছিল দায়িত্বশীলদের কাছে। আমাদের জন্য ভাবনার একটা মেশিন ছিল- সেটা আমাদের প্রাণের চেয়েও প্রিয় সংগঠন।
কিন্তু একি! আজ আমাকে ভাবতে হবে আমি কী করবো? আমি বলে যে আমার একটি জিনিষ আছে তাতো কখনো ভাবিনি।
মোটর সাইকেলে চড়িয়ে বিনা দ্বিধায় সংগঠনের ভাইদের জীবনের মোড় এক সময় আমাকেও ঘুরাতে হয়েছে। এখনও মনে পড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শফিকুল ইসলাম মাসুদ কে উইথড্র করে কেন্দ্রে আনতে গিয়ে কী কান্নার রোল পড়েছিল সারা ক্যাম্পাসে। খড়খড়ি গ্রামে রাতে দাওয়াত ছিল ক্ষুদে শিল্পী মুজাহিদ ও বিপ্লবী কর্মী লালটু দের বাড়ীতে। মা, ভাই, বোন, ভাবী সবার কান্নার তোড়ে একসময় আমাকেও ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদতে হয়েছিল। ফরিদপুর শহর থেকে জহির উদ্দিন বাবর ভাইকে উইথড্র করে নিতে গেলাম বরিশালে। প্রথম বাঁধা দিলেন মুরুব্বীরা। কর্মী সমাবেশে কর্মীরা কাঁদতে কাঁদতে কয়েকজন বেহুঁশ হয়ে গেলেন।
মাসুদ আজ রাজশাহী কাল ঢাকায়, বাবর আজ ফরিদপুর কাল বরিশালে। এরকম হাজারো ভাইয়েরা ভাবতেও পারেনি কাল তাঁর দায়িত্ব কোথায়? কোথায় হবে তাঁর বসবাসের স্থান!
কিন্তু আজ আমাকেই ভাবতে হবে আমি কী করবো!
কী নির্দয় ভাবে বাবা তাঁর তিলে তিলে জীবন শেষ করা পঙ্গু ছেলেটাকে বলতে পারে- সেটা তোমার ব্যাপার তোমাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তুমি কী করবে?
আমার চোখে জলের বন্যা। অভিমানে আমি কুঁড়ে কুঁড়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি।
মগবাজার থেকে লালমাটিয়া পর্যন্ত রিক্সায় আসতে আসতে আমার বুক ভেসে গেছে। রিক্সা ড্রাইভার বার বার পেছন ফিরে চাইছিল।
কী হতো আমাকে ৬ মাসের জন্য ছুটি দিলে। আমি যেবার প্রথম কার্যকরী পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হই তখন প্রায় পুরো সময়টাই ছিলাম জেলে, শপথও নিতে পারিনি। পরিষদের শেষ অধিবেশনে আমার শপথ হয়। এই যে প্রায় এক বছর কোন কাজ করতে পারলাম না। সংগঠন কী থেমে ছিল?
আমার জীবনের একটা বড় অংশ কেটেছে হাসপাতালে। তখনতো আমি কোন কাজ করতে পারিনি! যে সকল দায়িত্বশীল বিদেশে পড়তে যায় তারাতো বছরের পর বছর ছুটি পায়। যারা বিশেষ নাজুক জায়গায় কাজ করে তাদেরতো কোন রিপোর্টের আওতায়ও আনা হয়না। এসব ভাবি আর আমার বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। আহা ছাত্র আন্দোলন আর মুরুব্বী আন্দোলনে কত পার্থক্য!
অভিমান ও কষ্টে একা একা গুমরে মরি। কয়েকদিন ধরে এস্তেখারা করি। একা একা নিজেকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করি। মনকে প্রবোধ দেই। দুই দায়িত্বশীলের কিছু কথা এস্তেখারায় কঠিন ভাবে রেখাপাত করে।
“সবার সব দায়িত্ব নয়, যার যে যোগ্যতা তাঁকে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে”।
“তুমি যদি সহীহ থাক তোমার নিয়ত যদি সহীহ থাকে কোন সমস্যা নাই”।
“যদি ভালো কিছু করে দেখাতে পারো তবে সবাই তোমাদের বাহবা দিবে, স্বাগত জানাবে। ত্রুটি বিচ্চুতি কিছু হইলে ভুলে যাবে।”
জায়নামাজে গড়াগড়ি করে নিঃশব্দ ক্রন্দন নদী পেরিয়ে আমি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করি।
জীবনে তিনবার শহীদ হওয়ার সুযোগ এসেছিল আমার। চূড়ান্ত ভাবে নিজেকে সঁপেও দিয়েছিলাম। তপ্ত লহুতে জমিনে শূলবিদ্ধ হয়েছি কিন্তু শাহাদাতের সৌভাগ্য হয়নি। আজ আবার অনেক ভেবে চিনতে মহান আল্লাহর সাথে ফায়সালা করে নতুন করে মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিলাম।
এ কেমন মৃত্যু!
আমার নিজের অন্তরের কাছে আমি এই মৃত্যুর শিরোনাম দিয়েছিলাম “একজন এক্স সিপি’র মৃত্যু”।
হ্যাঁ প্রিয় ভাই ও বোনেরা আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন। আমার এক নাম্বার সিদ্ধান্ত ছিল আমি সেদিন থেকে নিজেকে নিজে পারতপক্ষে কোথাও এক্স সিপি হিসেবে পরিচয় দিবনা।
সচেতন ভাবে আমার কোন বায়োডাটা, প্রোফাইল, কার্ড কিংবা সামাজিক পরিসরে এ পরিচয় আমি এভয়েড করার চেষ্টা করবো। কারণ আমি যে কাজ করতে চাচ্ছি তাঁর দায় একান্ত আমার। আমার ভুল, ত্রুটি, বিচ্যুতি আমারই। এই দায় আমার পবিত্র সংগঠনের নয়। আমার এক্স সিপি পরিচয়ের গায়ে আমি কোন কালিমা লাগাতে চাইনা।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এখন থেকে কোন টিসি, টি,এস এ আমি আলোচনা করবোনা। কোন সমাবেশে বক্তব্য দেবনা। সবক্ষেত্রে লো প্রোফাইল মেনে চলব। তবে সেটা কাউকে আমি বুঝতে দিবনা।
আমি ধীরে ধীরে নিজেকে নেতা থেকে কর্মী পর্যায়ে নামিয়ে আনবো। এর জন্য আমি কোন ঘোষণা দেবনা। শুধুমাত্র দায়িত্বশীলেরাই বিষয়টা জানবেন এবং টের পাবেন। আমি দিগন্তে এবং মিডিয়া ক্ষেত্রে নিজেকে পরিপূর্ণ ভাবে নিয়োজিত করবো। এর যে প্রতিশ্রুতি তা অর্জন করাই আমার আপাততঃ লক্ষ্য। আমার সিদ্ধান্ত যেহেতু আমাকেই নিতে হবে তাই অবশেষে দুরু দুরু বুকে চ্যালেঞ্জ টা আমি নিলাম।
আমি আমার সচেতন বন্ধুদের নিকট বিনীত ভাবে আরজ করবো। আপনারা লক্ষ্য করলে দেখবেন গত ৮-১০ বছরে মিডিয়া বা সেই সংক্রান্ত আলোচনা ছাড়া আমাকে আপনি কোথাও দেখেননি কিন্তু। ব্যানারের সামনে পেছনে, বক্তার ডায়াসে খুব একটা দেখেননি। ছাত্রদের অনেক টিসি, টিএস আমি বিনয়ের সাথে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছি। যেখানে পারিনি সেখানে মিডিয়া নিয়েই শুধু আলোচনা করেছি।
আমি আপনাদের জ্ঞাতার্থে স্পষ্ট করে বলতে চাই। আমি নিজে মিডিয়ায় যে দায়িত্ব পালন করছি তা শরিয়াতের সাধারণ চোখে স্পষ্ট লঙ্ঘন। সেরকম পেশাগত কাজে নিয়োজিত থেকে অন্যকে শরিয়াতের তালিম দেয়া, নীতিকথা শোনানো স্পষ্ট অসাধুতা বলে আমি মনে করি। অতএব আমার এই অবস্থান একান্ত আমার ব্যক্তিগত। কোন ভাঙ্গা গড়ার মধ্য দিয়ে আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি তা আপনাদের এতগুলো পর্ব লিখে আশাকরি পরিষ্কার করেছি।
ইত্যবসরে অনেকে আমাকে ভুল বুঝেছেন। আমার এই লো-প্রোফাইল, নিজেকে গুটিয়ে নেয়া অনেকে পছন্দ করেননি। আমার ব্যক্তিগত কিছু বন্ধু আছে যারা অত সাংগঠনিক নিয়ম নীতি বোঝেন না, তাঁরা অনেক সময় হেয়ালী করে বলেছে আমি নাকি রাজনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়ছি। আমি এসকল তির্যক মন্তব্য সহজেই হজম করেছি এবং প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছি।
কিন্তু এক্স সিপি পরিচয় চাইলেই কী মোছা যায়? আমি বললেই কী আমার কাজের দায় একান্ত আমার হবে সংগঠনের কাঁধে আসবেনা?
হ্যাঁ কথাটা সত্য। আমি চাইলেই এই পরিচয় মুছে যাবেনা, দায় মুক্তও হওয়া যাবেনা। কিন্তু আমার কী করনীয় আছে বলুন? আমাকেতো আমার কাছে পরিস্কার থাকতে হবে।
রাসুল(সঃ) এর মানুষ হিসেবে সাধারণ কাজ কর্মে লোকেরা অবাক হতো! বলতো এ কেমন রাসূল! হাঁসে, প্রিয়জনের মৃত্যুতে কাঁদে, আঘাত পেলে ব্যথা পায়! ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে! সবার সাথে একসাথে বসে গল্প করে, রসিকতা করে!!!!
একজনএক্স সিপি হিসেবে আমার জীবনটাকে খুব রেসট্রিকটেড মনে হয়েছে। আমার ৭৫ বয়সোর্ধ্ব মাকে নিয়ে তাঁর অনুরোধে তাঁর সাথে আমার একটা ছবি পোস্ট করতে গেলেও আমাকে অনেক ভাবতে হয়।
বাংলাদেশ ক্রিকেট দল পাকিস্তান কে পরাজিত করায় আনন্দ প্রকাশ করে আমার দেয়া পোস্ট নিয়েতো মহা হুলুস্থুল।
একজন সাধারণ মুসলমান যা করতে পারে আমি তা করতে গেলে প্রশ্ন সৃষ্টি হবে কেন? আমাকে সবসময় এক্স সিপির একটা কৃত্রিম মুখোশ পড়ে থাকতে হবে। আমার হাসি, কান্না, এক্সপ্রেশন অন্যদের চেয়ে আলাদা হতে হবে। সবসময় মাথায় রাখতে হবে আমাকে অন্যরা ফলো করছে। আমার প্রতিটি কথা, বার্তা, চাল-চলনে অন্যদের উপর প্রভাব পড়ছে। এই অন্য কারা? তাঁরা আমার মতই মানুষ। অর্থাৎ কথাটা অনেকটা এমন যে মহান আল্লাহ কে নয় আমার পরিচিত মানুষ গুলোকে ভয় করেই আমাকে চলতে হবে প্রতিনিয়ত। আমার কাছে এই কনসেপ্ট কে চরম মূর্খতা মনে হয়। আপনাদের আবেগ, সম্মান এবং সকল যুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলছি আমি এই কৃত্রিমতা মানিনা।
এখন তাহলে আমাকে কী করতে হবে?
আপনারা হয়তো বলবেন, একটা পথ আছে আপনি নিজ থেকে ঘোষণা দিয়ে নিজেকে এই এক্স সিপির খোলস থেকে অবমুক্ত ঘোষণা করুন। কিন্তু বিশ্বাস করুন এটা আমি নিজেও অনেকবার ভেবেছি। এটা ভাবতে গেলে আমার হাত পা অসাড় হয়ে আসে। প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে কান্না আসে।
এই আন্দোলনের জন্য আমি আমার পরিবার কে ছেড়েছি। আমার শরীরের প্রতিটি অনু পরমানুতে এই আন্দোলনের স্মৃতি গ্রন্থিত। জীবনে কোন স্বপ্ন বুনিনি, একটাই স্বপ্ন বুনেছি শুধু যার নাম বিপ্লব। আমি এই বিপ্লবের পথ ছেড়ে কোথায় যাবো?
কেবল আপনারাই পারেন আপনাদের হৃদয়তন্ত্রী থেকে আমাকে মুক্তি দিতে। আমার মত একজন এক্স কে ভুলে যান। স্মরণ থেকে মুছে ফেলুন। আমাকে এক্স সিপি হিসেবে গণ্য করবেননা। আপনাদের যাদের দৃষ্টিতে আমি গোমরাহ, ফেতনা সৃষ্টিকারী, এজেন্ট, বেয়াদব, অধঃপতিত, বিপথগামী এবং এরকম আরও অনেক কিছু। প্লিজ এর সব দায় একান্ত আমার ব্যক্তিগত। এই অধঃপতন ও দায় এক্স সিপি’র নয়।
আপনারা যারা আমাকে আগে দেখেননি, আমার সম্পর্কে জানেননা তাঁরা বিশ্বাস করুন আমি সারাজীবন এমনই ছিলাম। আমাকে যারা বহুদিন ধরে চেনে, যাদের আদরে শাসনে আমি সংগঠনে অগ্রসর হয়েছি তাদের কাছে জেনে দেখতে পারেন। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট, পুরো চট্টগ্রাম শহর, বিশ্ববিদ্যালয়ের আলো বাতাসে খোঁজ নিয়ে দেখুন আপনারা এই বেয়াদব, বিপথগামী, মিথ্যাবাদী, অধঃপতিত আমাকে আজকের মতই পাবেন।
আমার লেখা ১০ থেকে ১২ টি গানের মিউজিক ভিডিও হয়েছে। যেখানে জাতীয় পর্যায়ের শিল্পীরা গান গেয়েছে এবং এগুলো টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়েছে। আমার লেখা ১৫ টির মত নাটক ও সিরিয়াল অনএয়ায় হয়েছে, যাতে জাতীয় পর্যায়ের শিল্পীরা অভিনয় করেছে। আমি একজন ব্রডকাস্টার হিসেবে বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরা, ফক্স নিউজ হেড কোয়ার্টারে আমন্ত্রিত হয়ে ভিজিট করেছি। হলিউডের মুভি ফেয়ারে অংশ নিয়েছি। ব্রডকাস্ট ম্যানেজমেন্টের উপর বিবিসি তে ট্রেনিং করেছি। টেলিভিশনের প্রিভিউ কমিটির মেম্বার হিসেবে দেশী বিদেশী কয়েকশত ছবি প্রিভিউ করেছি এবং রিভিউ লিখে মতামত দিয়েছি। আমি এসব করেছি আমার প্রফেশনাল এসাইনমেন্ট হিসেবে। এগুলো কোন লুকানো ছাপানো বিষয় ছিলনা। কিন্তু আমার মুভি’র রিভিউ দেখে যারা অবাক হয়েছেন বলতে পারেন আমি উল্টো আপনাদের কথায় হতবাক হয়েছি!
আমি মিডিয়ায় কাজ কেন করি? এর ব্যাখ্যা, বুঝ, মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা একান্ত আমার। আমি এগুলো করেছি মানে এ নয় যে এগুলো আপনাদের জন্য জায়েজ ও হালাল। আমি করেছি বলে আপনাদেরও তা করতে হবে এটা জাহেলি ও অনেইস্লামিক যুক্তি।
এক খেজুর গাছের বাকল ছিলে অন্য গাছে লাগানো সংক্রান্ত রাসুল (সঃ) এর একটি প্রসিদ্ধ হাদীস আছে তা পড়ে দেখবেন সেখানে কী বলা আছে।
অনেকে বলেছেন আমি প্রফেশনাল কারণে এসব করেছি বা করি ঠিক আছে কিন্তু তা প্রকাশ করা উচিত হয়নি। প্রিয় বন্ধু এটা আপনার মত, তাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি। কিন্তু আমার জ্ঞানঃত এটা ভুল চিন্তা। মানুষ কী ভাববে, আমার কাজের প্রতিক্রিয়া মানুষের কাছে কী হবে এটা ভেবে নিজেকে আড়াল রাখা কে সম্ভবত শিরক বলে।
আরেকটি কথা অনেকে মনে করেছেন আমি এখানে অপ্রাসঙ্গিক ভাবে দিগন্ত টিভি’র কাহিনী কেন এনেছি? আসলে এখানে বলতে গেলে দিগন্ত প্রসঙ্গটি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। আমার মূলধারার মিডিয়ায় নিজেকে সম্পৃক্ত করার যে মানসিক দ্বিধা ও ইতিহাস এবং কেন আমি দেশে আলোচিত দুটি মুভি দেখলাম এবং তাঁর রিভিউ লিখলাম সেটা বোঝাতে আমাকে দীর্ঘ ঘাত প্রতিঘাত ও রুপান্তরের কথাটা বলতে হলো।
যারা কষ্ট করে আমার এতদিনকার এই বয়ান পড়েছেন, মতামত দিয়েছেন, নানা প্রশ্ন করে আমাকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন- আপনাদের সবার প্রতি আমি অতিশয় কৃতজ্ঞ। আমার কথায় কোন কষ্ট পেলে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।
আপনাদের জ্ঞাতার্থে শুধু এতটুকু বলি আমার একান্ত প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় শহীদ দায়িত্বশীল যে কয়টি কথা বলেছিলেনঃ “কমপ্লেন কেন আসবে? কমপ্লেন আসার মত কাজ করবা না, তাইলেই তো হলো।
শোন তুমি যদি সহীহ থাক তোমার নিয়ত যদি সহীহ থাকে কোন সমস্যা নাই।
তোমরা বলছো তোমরা নতুন ধারা সৃষ্টি করবা।
শালীন, সত্য সুন্দরের পক্ষে টেলিভিশন করবা।
যদি ভালো কিছু করে দেখাতে পারো তবে সবাই তোমাদের বাহবা দিবে, স্বাগত জানাবে”।
অত্যন্ত বিনীত ভাবে আপনাদের সদয় অবগতির জন্য বলছি এ পর্যন্ত আমাদের বিরুদ্ধে শ্রদ্ধাভাজন দের কাছে কোন কমপ্লেন আসেনি। আর আমরা আমাদের কর্মী কলা কুশলীরা সবাই মিলে নতুন ধারা সৃষ্টি করতে পেরেছিলাম কিনা, ভালো কিছু করে দেখাতে পেরেছিলাম কিনা তাঁর স্মৃতি ও ইতিহাস কখনো সময় সুযোগ পেলে লিখার আশা রাখি। আজ শুধু এতটুকু বলি দিগন্ত বন্ধ হওয়ার পর অগনিত মানুষের কাছে যতবার শুনেছি তাঁরা এরপর টিভি দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন। ততবার বুকের মধ্যে দোলা অনুভব করেছি, যেই দোলার ভাবার্থ করলে দাঁড়ায়- আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন। (সমাপ্ত)
Comments
Post a Comment