মুখোশের বয়ান - ০৭

#মুখোশের_বয়ান_সপ্তম …… (পূর্ববর্তী অংশের ধারাবাহিকতায়--) জোশের বশে অনেক্ষণ কথা বলে আমি একটু থামলাম। দেখলাম সবাই আমার দিকে চেয়ে আছে। একটু লজ্জিত হলাম। লজ্জা ঝেড়ে আবার শুরু করলাম, - বেয়াদবী হলে ক্ষমা করবেন। আমি আপনাদের ছাত্র হওয়ারও যোগ্য নই। খোলামেলা কথা বলে মনের কিছু খটকা দূর করতে চাই। তাঁরা বললেন অসুবিধা নাই বলো- - আমাদের প্রিয়নবী রাসুল(সঃ)কী একসাথে শরিয়াহ’র বিধি বিধান নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন? - না হন নাই। - আমি যতটুকু জানি তিনি নিজে থেকে পথ বের করার চেষ্টা করেছিলেন। চিন্তা জগতে তাঁর আলোড়ন উঠেছিল। তিনি দিনের পর দিন ভেবেছেন। পথ খোঁজার চেষ্টা করেছেন। নিজ চিন্তা থেকে কিছু কার্যকর পদক্ষেপও নিয়েছেন। নবূওয়াত প্রাপ্তির পর তাঁর সমাজ পরিবর্তনের কাজ ও দায়িত্ব বেড়ে যায়। কাজ করতে করতে তাঁর পথ খোলাসা হয় এবং ধীরে ধীরে নানা চড়াই উৎরাই ও একটি বিপ্লবের পথ পরিক্রমায় শরিয়াহ’র বিধানও তাঁকে দেয়া হয়। এভাবে একদিকে একটি ইসলামী সমাজ এবং কল্যাণকর বিধিবিধান পূর্ণতা লাভ করে। আমার কথা থামিয়ে মদীনা থেকে পাশ করা বিশেষজ্ঞ বললেন, এসব কথাতো আমরা জানি, ঠিক আছে। কিন্তু আপনি এসব না বলে মূলকথা কী সেটা বলেন। আমি বললাম, আমার কথা হলো রাসুল (সঃ) মূলধারায় কাজ করেছেন, তিনি আলাদা করে কোন ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করেননি। মূলধারায় থেকে মূলকে সংশোধন করেছেন তিনি। সেক্ষেত্রে তাঁর নীতি ছিল ন্যায়-অন্যায়, শ্লীল-অশ্লীল, সত্য-মিথ্যা, কল্যাণ- অকল্যাণ মেনে চলা, ইসলামী শরিয়াত নয়। ফলে সে সময়ে পর্দা, গান, বাজনা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক রসম রেওয়াজ নিয়ে কোন কথা উঠেনি। এমনকি ক্বাবা ঘর থেকে মূর্তি অপসারণের চিন্তাও করা হয়নি, সে অবস্থায় তিনি ক্বাবা তাওয়াফ করেছেন। শরিয়াহ কায়েম হয়েছে সমাজে ইসলামাইজেশনের পরে। আমি মনেকরি শরিয়াহ’র ইমপ্লিকেশন প্রাথমিক স্তরে নয়, চূড়ান্ত স্তরে এবং সেটা ধীরে ধীরে। চোরের হাত কাটা শরিয়াহ আইনের একটি বিধান কিন্তু সমাজে যদি খাদ্যের অভাব থাকে তাহলে সে আইন কী কার্যকর থাকবে? থাকবেনা, সেটা স্থগিত থাকবে। তেমনি ভাবে সমাজের অধিকাংশ লোক যদি হয় ইসলামী চেতনার পরিপন্থী, সেখানে আমরা যদি প্রথমে শরিয়াহ কে সামনে আনি তাহলে চিন্তাটা কী ইসলাম সম্মত হবে? বাংলাদেশ ইসলামী রাষ্ট্র নয় এটা একটা সেকুলার রাষ্ট্র। এর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল আইয়ামে জাহেলিয়াতের চাইতেও খারাপ অবস্থানে আছে। সে অবস্থায় আমরা ইসলামী শরিয়াহ নয় বরং ন্যায়-অন্যায়, শ্লীল-অশ্লীল, সত্য-মিথ্যা, কল্যাণ-অকল্যাণ মেনে মূলধারার একটা টিভি স্টেশন অপারেট করতে চাচ্ছি। আমরা যদি এই অপসংস্কৃতির ধারায় দাঁড়িয়ে একটি ক্ষুদ্র ইতিবাচক পথ তৈরি করতে পারি সে পথ ধরে ধীরে ধীরে আরও শালীন, শ্লীল, কল্যাণকর স্পৃহা তৈরি করবে। ক্রমান্বয়ে মানুষের মনোজগৎ বদলাবে। সত্য ও ইতিবাচক পথের অনেক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী, কলাকুশলী তৈরি হবে। নিকট ভবিষ্যতে যে কল্যাণকর সমাজ ও রাষ্ট্র গঠিত হবে সেখানে একটি শরিয়াহ ভিত্তিক সাংস্কৃতিক জগত বা মিডিয়া তৈরি সহজতর হবে। ব্যাস আমার কথা শেষ। বরিষ্ঠ আলেম মুরুব্বি এতক্ষণ হাল্কা চোখ বুজে কথা শুনছিলেন। চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন- তুমি কী মাদ্রাসায় পড়েছ? - না সেই সৌভাগ্য হয়নি আমার। - মা’শাআল্লাহ! ভালোই বলেছো, তোমার বিশ্লেষণ খুব ভাল লেগেছে। তিনি এবার হানিফ ভাই এবং মাহবুব ভাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমাদের কাছ থেকে আপনারা ফতওয়া চাননা, পথ নির্দেশিকা চান। আমিতো দেখছি এ সংক্রান্ত গবেষনায় আপনারা অনেক অগ্রসর। আপনাদের সার্বিক কথায় যেটা বুঝলাম সেটা হলো- আপনারা একটা শালীন, অশ্লীলতা মুক্ত মূলধারার টেলিভিশন করতে চান। কিন্তু মূলধারা বলতে যে জায়গাটা সেটা ময়লা আবর্জনায় ভর্তি। সেটার উপরদিয়ে কীভাবে চলবেন সেটা হলো প্রশ্ন? আপনাদের প্রশ্নটা অনেকটা এরকম যে আপনার ঘর থেকে মসজিদে যাওয়ার যে একমাত্র রাস্তা সেটার মধ্যে নানা নাপাকী ছড়ানো ছিটানো আছে। তার উপর দিয়ে হেটে গেলে কাপড় বা অজু নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এখন আজান শোনার পর আপনি মসজিদে গিয়ে নামাজ কায়েম করবেন না ঘরে বসে একা নামাজ পড়বেন? উসুলের নীতি হলো আপনাকে সেই নাপাকীর উপর দিয়েই মসজিদে যেতে হবে তবে খুব সাবধানে। যথাসম্ভব কাপড় এবং শরীর রক্ষা করার চেষ্টা করতে হবে। তারপরও কাপড় এবং শরীরে যদি কোন নাপাকী লাগে তাহলে মসজিদে প্রবেশের আগে ধুয়ে পাক-সাফ হয়ে মসজিদে ঢুকে নামাজ কায়েম করতে হবে। তাঁর কথার সাথে সুর মিলিয়ে মাদানী বিশেষজ্ঞ বললেন। বাংলাদেশে যে সকল ইসলামী সংগঠন রাজনৈতিক দল হিসেবে কাজ করছে তাদের কর্মকৌশলও তো আপনাদের মত। তারাও তো মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে মিলে মিশে রাজনীতি করছে। রাজনীতির ময়দান তো আরও বেশী অনৈসলামিক। মিছিল, স্লোগান, মারামারি, কাটাকাটি, হরতাল, ইলেকশন, পদ ভাগাভাগি, কোন্দল ইত্যাদি। চিন্তাশীল আলেমরা যখন এই প্রচলিত রাজনীতিতে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তখন অনেকে বলেছেন এই রাজনীতি শরিয়াহ সম্মত নয়। এই রাজনীতি কুফরী। কিন্তু আজ প্রায় সকল ওলামারাই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছেন। মূলধারার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আন্দোলন, সংগ্রাম, হরতাল, মানব-বন্ধন, অবরোধ, ভোট, সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা এগুলো জায়েজ কী নাজায়েজ তা নিয়ে বিতর্ক কিন্তু কম নাই। তবে আমি মনেকরি তাঁরা একটা সমস্যা করেছেন, সেটা হল তাঁরা ইসলামী নামে দল খুলেছেন। ফলে তাদেরকে সবসময় জায়েজ-না জায়েজের প্রশ্ন বানে জর্জরিত হতে হয়। তাঁরা যেসব কর্মকাণ্ড করছেন সেটা ইসলামের সাথে যায় কিনা তা পাবলিক সবসময় মনিটর করে। কিন্তু আপনারাতো ইসলামী নামে চ্যানেল খুলছেন না। ইসলামী সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথাও বলছেন না। আপনারা বলছেন সত্য ও সুন্দরের পথে চলার কথা। আমি মনেকরি কৌশলগত পথ হিসেবে আপনাদের চিন্তা সঠিক এবং যথার্থ। এবার আর কেউ কথা বললেন না সবাই মিলে একমত হলেন। মুরুব্বী আলেম বললেন, আমরা কিছু পরামর্শ দিতে পারি- যদি আপনারা মেনে চলেন। আমরা সমস্বরে বললাম অবশ্যই। তাঁরা সবাই মিলে কিছু গাইড লাইন দিলেন-- ১) আপনারা মূলধারার টেলিভিশন হিসেবে আত্ম-প্রকাশ করবেন ঠিক আছে কিন্তু অশ্লীল, উৎকট, অতিরঞ্জিত, কৃত্রিম, বিতর্কিত বিষয়াদি পরিহার করার চেষ্টা করবেন। আপনাদের টেলিভিশনের ইমেজ যেন হয় শালীন ও মার্জিত। ২) হালাল-হারাম, জায়েজ-নাজায়েজ, উচিত-অনুচিত বিতর্কে আপনারা জড়াবেননা। সমলোচনার জবাব মুখে নয় নিজেদের কাজ দিয়ে আপনারা দেয়ার চেষ্টা করবেন। ৩) যত গালি গালাজ বা কুৎসা রটানো হোকনা কেন আপনারা ধৈর্যশীলতার নীতি অবলম্বন করবেন। ৪) এটা আপনাদের কৌশলগত পথচলা। সতর্কতার সাথে পথ চলতে হবে। মূল লক্ষ্য ও নিয়ত অর্জনের বাসনা সবসময় মাথায় রাখতে হবে। ৫) বাজারের কলাকুশলী বা অনুষ্ঠানের উপর আপনারা নির্ভরশীল হবেননা, ক্রমান্বয়ে তা কমিয়ে নিজেদের তৈরি জনবল ও নিজস্ব চিন্তার অনুষ্ঠান তৈরি করার চেষ্টা করবেন। শ্রদ্ধেয় আলেমদের মতামত, মূল্যবান পরামর্শ পেয়ে বুকটা বেশ হাল্কা হয়ে যায়। মাথার উপর থেকে একটা বড় বোঝা যেন সরে আসে। চলার পথের গতিটা এবার বাড়বে ইনশাআল্লাহ্। খুশী মনে একে একে সবাইকে বিদায় দিলাম। যাওয়ার সময় মুরুব্বী আলেম একান্তে আমাকে কাছে ডাকলেন। খুব স্নেহ ভরে মাথা ও কাঁধে হাত রাখলেন। আস্তে করে বললেন, তোমার এখন সাংগঠনিক দায়িত্ব কী? - আমি বললাম, কেন? - খুব কঠিন কাজে তোমরা হাত দিয়েছ। তোমার সাংগঠনিক পরিচয় এবং দায়িত্ব এই কাজের সাথে কনফ্লিকট তৈরি করবে। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। তারপর বললাম, আমার কী তাহলে ঊর্ধ্বতন মুরুব্বীদের সাথে কথা বলে অনুমতি নেয়া দরকার আছে? - হ্যাঁ তুমি কথা বল, তবে অনুমতি পাওয়ার সম্ভাবনা কম। আমি তাঁর কথার শানে নুজুল বুঝতে পারলাম না। তিনি হাত মিলিয়ে গাড়ীতে উঠে গেলেন। আমি ফ্যালফ্যাল করে তাঁর যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে থকলাম...। (অসমাপ্ত...... চলবে)

Comments

Popular posts from this blog

মঙ্গল শব্দের অর্থ কি ?

অ্যান্ড্রয়েড ফোনে এয়ারপ্লেন মোড সর্ম্পকে জানুন

এসো হে বৈশাখ

কেন বিচ্ছেদের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রাক্তনকে ব্লক করা উচিত ?

মূল্যমানে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ১০ মুদ্রা

জরুরী হেল্পলাইন সেবা

ভার্চুয়াল জীবনের গোধূলীবেলায়