মুখোশের বয়ান - ০৯
#মুখোশের_বয়ান_নবম (পূর্ববর্তী অংশের ধারাবাহিকতায়…)
হানিফ ভাইয়ের মুখে ক্রমাগত বিষ উদ্গীরন হচ্ছে। তিনি বলেই চলেছেন,
- তোমাদের সমস্যা কী জানো! তুমি নিজে যখন সীমা ক্রস করো, নীতি আদর্শের সাথে কম্প্রোমাইজ করো তখন সেটা কোন না কোন যুক্তিতে এক্সেপটেবল বা জায়েজ। কিন্তু আরেকজনের কোন বিচ্যুতি বা স্খলন দেখলেই তুমি তাঁর উপর চড়াও হচ্ছো, তাকে নাজেহাল করে ছাড়ছো।
তাঁর প্রকৃত অবস্থা কী?
কেন সে এই অবস্থায় পতিত তা বিবেচনায় নিচ্ছনা।
আচ্ছা তোমাদের বহু বড় বড় নেতাতো আছে ডাক্তার। সে যখন ছাত্র ছিল গাইনী বিষয়ে, স্ত্রী রোগ বিষয়ে সে কী পড়েনি? তাঁকে কী প্রাকটিকেলি এসব বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে হয়নি?
একজন ডেন্টিস্ট যখন কোন মহিলা রোগী দেখে তাঁকে সেই মহিলার মুখ, ঠোট স্পর্শ করতে হয়। শরীয়তের দৃষ্টিতে নির্ঘাত তাঁর পর্দা লংঘন হয়। কিন্তু সেতো আসলে নারীর শরীর দেখেনা সে দেখে রোগীর শরীর। তোমাদের একজন এক্স সিপি আছে লন্ডনে থাকে সে আমার দেশী লোক। বিখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ। যেসব বৃটিশ মহিলারা তাঁর কাছে চক্ষু পরীক্ষা করতে আসে তাদের পোষাক-আশাকের অবস্থা কেমন থাকে? শরিয়াহর দৃষ্টিতে তাঁর কী পর্দা রক্ষা হয়? যতটুকু জানি সে খুব পপুলার ডাক্তার! এখন তুমি যদি বল আমার দলের এক্স সিপি প্রতিদিন পর্দা লংঘন করে অতএব আমিও করবো তাহলে আমি বলবো তুমি একটা মস্ত বড় জাহেল।
বিটিভি তে আমাদেরকে সারাজীবন সেকুলারদের কাছে নিগৃহীত হতে হয়েছে।
রাজাকার, মৌলবাদী, ধর্মান্ধ গালি শুনতে হয়েছে। মার খেতে খেতে, অপমানিত, অপদস্ত হতে হতে নিজেদের এক্সিজটেন্সের জন্য একসময় সেখানকার ইন্টারনাল পলিটিক্সে আমরা ইনভল্ব হই।
এর জন্য ভাব নিতে হয়েছে, অপসংস্কৃতির গুরুদের সাথে তাল মিলাতে হয়েছে।
আমাদের জন্য তদবীর করার কেউ ছিলনা, কেউ চাকুরীও ম্যানেজ করে দেয়নি। কিন্তু ফতওয়া দেয়ার, দৃষ্টি আকর্ষণ করার লোকের মাশাআল্লাহ অভাব নাই।
একদিন আমার শ্রদ্ধেয় সিনিয়র বড় ভাই ও দায়িত্বশীল- সাবেক এম,পি ও মন্ত্রীতো মুখের উপর বলেই বসলেন আমি যে স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছি তাতে আল্লাহ্র কাছে কী জবাব দিবো? আমার আয়, বেতন ইত্যাদি হালাল কিনা? আরও অনেক কথা।
আমার ইচ্ছে হয়েছিল তাঁকে পাল্টা জিজ্ঞেস করি আপনার আয়ের উৎস কী? পার্টির দায়িত্ব পালন করে তার বিনিময়ে ভাতা নেয়া, বেতন নেয়া হালাল কিনা?
কিন্তু কষ্ট পাবেন দেখে মুখের উপর বলিনি।
খুব দূঃখ পেয়েছিলাম সেদিন। অপমানিত বোধ করেছিলাম।
কিন্তু মজার ব্যপার কী জানো! আমি যখন ডিডিজি নিউজ হলাম তিনি সুপারিশ পাঠালেন তাঁর মেয়ে জামাই কে সংবাদ পাঠক হিসেবে এনলিস্ট করার জন্য।
তৎকালীন তথ্যমন্ত্রীর সাথে দিনরাত তদবীর করে তাঁকে আমরা সংবাদ পাঠক হিসেবে ঢুকাই।
প্রচুর সমলোচনা হয়। কারণ সে ছিল পরিচিত মুখ এবং কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক।
আমাদের মুখ রক্ষা হয় কারণ সে ছিল সংবাদ পাঠক হিসেবে খুবই যোগ্য।
অল্পদিনে নিউজ সেকশনের সবার সাথে তাঁর খুব ভাব হয়ে যায়। তাঁর মোলায়েম আচরণে সকলে মুগ্ধ হয়।
আচ্ছা তুমি বল, সে যে সংবাদ পাঠ করেছে সেখানে কী সব সময় ঈদের নামাজ আর মিলাদ মাহফিলের খবর ছিল?
সেখানে খেলার খবর ছিল, দুর্গা পুজা, কালী পুজা এমনকি হয়তো বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতার খবরও ছিল ।
স্ক্রিপ্টে যা লিখা ছিল তাঁকে তাই পড়তে হয়েছিল।
এখন কেউ যদি প্রশ্ন করে সে যে খবর পড়ে সম্মানী পেয়েছে তাঁর সেই আয় কী হালাল ছিল ?
তখন কেমন লাগবে?
কিন্তু বাংলাদেশ টেলিভিশনে খবর পড়ে সে যে তাঁর যোগ্যতার সাক্ষর রেখেছে। সেখানে তাঁর আচার আচরণে অন্যদের মধ্যে যে নৈতিক প্রভাব পড়েছে। জাতীয় পর্যায়ে তাঁর যে একটা স্বীকৃতি হয়েছে, এবং এটার কারণে সারাদেশে তাঁর যে একটা সেলিব্রেটি ইমেইজ তৈরি হয়েছে তাঁর সুফল কী আন্দোলন পায়নি?
আমি যতটুকু জানি তাঁর হাত ধরে শত শত ছেলে মিডিয়ায় তাঁদের ক্যারিয়ার করেছে। তাঁর কণ্ঠে অর্থ সহ কোরআনের অডিও বাংলাদেশে বেস্ট সেলার এবং জনপ্রিয়।
সে এখন জাতীয় মাণের একজন শিল্পী, অনেকের কাছে আইডল।
এর পেছনে তাঁর বিটিভি ক্যারিয়ারের অবদান কী কম?
সমস্যা হলো কিছু কিছু লোক দুই চারটা কোরআনের আয়াত আর হাদীস শিখে, শানে নুযূল, প্রেক্ষাপট কিছু না বুঝে একচোখা দৃষ্টি নিয়ে দ্বীনের বিশারদ বনে যাচ্ছে, আর ঘৃণা ছড়াচ্ছে।
আমি হানিফ ভাইকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলাম।
- অনেক হয়েছে এবার থামেন। চলেন গাড়ীতে উঠি।
হানিফ ভাই থামলেন ঠিকই কিন্তু ফস করে আমার সামনেই একটা সিগারেট ধরালেন, যা তিনি কখনই সাধারনতঃ করেন না। আমি আর তাঁকে চটালাম না, চুপ চাপ হজম করে গেলাম।
এভাবে চারিদিকের নানা ইনপুটে আমার মনের মধ্যকার অস্থিরতা কিছুটা কমতে থাকে।
মন কিছুটা সুস্থির হবার পর
যথারীতি সিপাহসালার কে সব কিছু জানানোর জন্য হাজির হই।
তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, তোমার সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে। তুমি ইস্তেখারা কর।
এই পথে আসলে সব ছেড়েটেড়ে সুদৃঢ় ভাবে আসতে হবে। মাঝপথে হাল ছেড়ে দেয়া যাবেনা।
- সব ছেড়ে বলতে আপনি কী বুঝাতে চাচ্ছেন?
- নেতাগীরি, শোয়িং, মিছিল, মিটিং, গরম গরম শ্লোগান, বক্তৃতা টিসি, T.S এ আলোচনা করে বেড়ানো! এসব!
আমি অবাক হয়ে বলি! এসব বাদ দিতে হবে?
- অবশ্যই। আমাকে দেখেছো কখনো মিছিলে?
- দেখেছি। আপনাকে অনেক গরম গরম ভাষণ দিতে দেখেছি।
- বাজে কথা বলোনা, বছরে ছয়মাসে দু-একবার দেখে থাকতে পারো। সেসব ধরতব্বের মধ্যে পরেনা। তাছাড়া আমার সাথে নিজেকে মিলাতে যেওনা। তোমার উপর যে দায়িত্ব, তুমি যদি মাঠে ময়দানে রাজনৈতিক ভাবে সম্পৃক্ত থাকো তাহলে তোমাকে সাংবাদিক বা মিডিয়া কর্মীরা এক্সেপ্ট করবেনা। তোমার লীডারশীপ তাঁদের কাছে আরোপিত হবে ন্যাচারাল হবেনা।
- তাহলে আমি এখন কী করবো? আমি কী উর্ধতন মুরুব্বিদের সাথে কথা বলবো?
- অবশ্যই বলবে। তুমি আপাততঃ বছর খানেকের জন্য সব ধরনের দায়িত্ব থেকে ছুটি চাও। খবরদার উনাদের কাছে আমার কথা ঘুনাক্ষরেও উল্লেখ করবেনা। বিষয়টা তোমার সিদ্ধান্ত ও তোমার।
- উনারা কী রাজী হবেন?
- সম্ভাবনা খুব কম। ফিল্ডের দায়িত্বশীলদের কাছে ফিল্ডের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাই বেশী। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে একজন দায়িত্বশীলের চাইতে তাঁদের কাছে একজন জেলা আমীর বেশী গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের অবস্থানে থাকলে আমিও হয়তো তাই ভাবতাম। একজন সিপি কে দুয়েক বছরের মধ্যে খুব সহজে জেলা আমীর করা যায়।তর তর করে সেই জেলা শক্তিশালী হয়ে যায়। সিলেট কে দেখ, কক্সবাজার কে দেখ।
মল্লিক ছিল বাগেরহাটের একটা ছোট্ট ইউনিটের সেক্রেটারি। তাঁকে যদি আমি জোর করে ঢাকা না আনতাম এতদিনে বড়জোর সে বাগেরহাট জেলা আমীর হতো। বাগেরহাট জেলা আমীর কে কয়জন চেনে? তুমি তাঁর নাম জানো?
- না জানিনা।
- মতিউর রহমান মল্লিক কে আজ সারা পৃথিবী চিনে।
- আমার জায়গায় আপনি মল্লিক ভাই কে সেট করলেন না কেন?
- সে তুমি বুঝবেনা। এখানেও একজন সিপি দরকার। যে ঝড়- সাইক্লোন এখানে আসবে তা মল্লিক সামলাতে পারবেনা। সিপি রা ঝড় সামলে সামলেই সিপি হয়।
কথাগুলো যে আমার ভালো লাগছিলো না তিনি বুঝতে পারলেন।
নাটকীয় ভাবে হঠাৎ আমাকে প্রশ্ন করলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ এর বর্ণিত একটা হাদীস বলতো দেখি?
আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। খালিদ বিন ওয়ালিদ এর হাদিস! লজ্জিত হয়ে বললাম, না মনে পড়ছেনা।
- কেন মহাবীর খালিদ কী রাসুল (সঃ) এর নিবিড় সংস্পর্শে ছিলেন না?
- অবশ্যই ছিলেন। রাসুল (সঃ)-ই তো তাঁকে সাইফুল্লাহ (আল্লাহ্র তরবারী) উপাধি দিয়েছিলেন।
- তাহলে সে রকম একজন বিখ্যাত সাহাবীর বর্ণিত কোন হাদীস নেই কেন?
- এটা কখনো ভেবে দেখিনি। হয়তো তাঁর বর্ণিত হাদিস আছে আমার জানা নাই, অথবা তিনি তেমন কোন হাদিস বর্ণনাই করেননি। অথবা তাঁর ব্যক্তিত্ব, স্মরণশক্তি ইত্যাদি বিবেচনা করে হাদিস সংগ্রহকারীগণ তাঁর হাদিস গ্রহণ করেননি।
- নো, তাঁর এক্সাপারটাইজ ছিল ওয়ার ফিল্ডে। হি ওয়াজ নট গ্রোউন আপ এস অ্যান ইনটেলেকচুয়াল বাট অ্যা সোলজার এন্ড আলসো দ্যা ফিল্ড মার্শাল। তিনি সাহিত্য বুঝতেন না, খুব ভালো বুঝতেন তরবারীর ভাষা।
আবু হোরায়রা কেন গ্রেট? সবচাইতে বেশী হাদিস বর্ণনার জন্য।
তাহলে কী বোঝা গেল? আবার সেই পুরানো কথা সবার সব কাজের দরকার নাই। যে যার ফিল্ড নিয়ে মনোনিবেশ কর এবং বেস্ট এফোর্ট দেয়ার চেষ্টা কর।
তাঁর শেষ কথায় আমার মাথা পরিস্কার হয়ে গেল। বুকের মধ্যে প্রচণ্ড কাঁপন শুরু হলো।
এই কম্পন আমার খুব পরিচিত। জীবনে বহুবার আমি এরকম কম্পন অনুভব করেছি।
অতিশয় ক্ষুদ্র আমার জীবন, তথাপী বড় বড় কিছু সিদ্ধান্ত আমাকে নিতে হয়েছিল। জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত!
বুক জুড়ে ছিল নিদারুণ ভয়, কাউকে বুঝতে দেইনি। সাহসের ভান করে সামনে এগিয়ে গিয়েছিলাম শুধু।
এই কম্পন জানান দিচ্ছে আমাকে এখন সিদ্ধান্ত ফাইনাল করতে হবে।
শলা পরামর্শ, ভাবনা শেষ।
নাউ সেন্স ইজ মেচিউড।
কম্পনের তরঙ্গ তাজা থাকতে থাকতেই উপস্থিত হলাম হৃদয়ের হেড কোয়ারটার মগবাজারে।
শীর্ষজন মুরুব্বী এঙ্গেইজ ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ একটি এপয়েন্টমেন্টে। আমাকে রেফার করা করা হল দৃঢ়চেতা প্রসন্নচিত্ত ফরিদপুরের কৃতি সন্তান এর কাছে। আমি খুব খুশী হলাম। একটি বিশেষ কারণে তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। কেন যেন একটু বেশী ফ্রী ছিলেন আমার সাথে। কিন্তু আজ আমি তাঁর মুখোমুখি অপ্রিয় বিষয় নিয়ে। তাঁর অভিজ্ঞ চোখে আমি ধরা পড়ে গেলাম। আমার চেহারা দেখে বললেন তুমি কী চিন্তিত কোন বিষয়ে?
(অসমাপ্ত......... চলবে... এরপর শেষ কিস্তি)
Comments
Post a Comment