মুখোশের বয়ান - ০৫
#মুখোশের_বয়ান_পঞ্চম ... (পূর্ববর্তী আলোচনার ধারাবাহিকতায়)
আমি তাঁর সামনের চেয়ারে বসে আছি অনেক্ষণ।
তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে হাতে থাকা পত্রিকা পড়ছেন। কোন কথা বলছেন না।
একসময় পত্রিকা থেকে মাথা তুলে বললেন কী খবর?
আমি মিটিং এর বিস্তারিত তাঁকে রিপোর্ট করলাম। তিনি মনযোগ দিয়ে শুনলেন, দুয়েকটি প্রশ্ন করলেন তারপর বললেন, যে কয়দিন দরকার ডিস্কাস্শন চলুক। এই ব্রেন স্টর্মিং এবং ডিবেট খুব দরকার আছে।
কোন সংকোচ ছাড়াই আমি এবার সরাসরি বললাম,
আমার মনেহয় আমাদের এ পলিসি গ্রহণ করা উচিত হবেনা।
- কেন?
- খুব সমলোচনা হবে। যেখানেই যাবো সেখানেই প্রশ্নের সম্মুক্ষীণ হতে হবে।
- অবশ্যই সমলোচনা হবে, কিন্তু তাতে কী!
- আমাদের কর্মীদের আমরা এতদিন গান, বাজনা, নাটক, সিনেমা দেখতে নিষেধ করেছি। যারা দেখেছে তাদের ভর্ৎসনা করেছি আর এখন আমরা নিজেরাই সেটা বানাবো! সম্প্রচার করবো! এটা কনট্রাডিক্টরী এবং নৈতিক দিক থেকে সিরিয়াস মুনাফেকী। আন্দোলনের জন্যও এটা হবে ইমেজ ডেমেইজিং।
- তিনি মুখে হাসি টেনে বললেন রাইট, ইউ আর এবসোলিউটলি রাইট। ভীষন সমলোচনা হবে এবং তা সহ্য করেই কাজ করে যেতে হবে।
- এটা খুবই বাজে ব্যাপার হবে, আমাদেরকে যারা আদর্শ মনে করে হৃদয়ে ঠাই দিয়েছে তাঁরা খুব হতাশ হবে। মনে করবে আমাদের কথা এবং কাজে মিল নেই। আমাদেরকে রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করে বলবে উনি যদি এরকম করতে পারেন, আমরা কেন পারবোনা!
তিনি আমাকে শান্তনা দিয়ে বললেন, একটু থামো, স্থির হয়ে বসো। তোমার সব কথাই ঠিক, এই সমস্যাগুলো আছে বলেইতো আমরা বিশেষজ্ঞদের মতামত জানতে চাইছি।
একটি ইসলামী টিভি খোলা তো কোন সমস্যা না।
আমরা যদি ইসলামিক টিভি খুলি সবাই বাহবা দিবে, কিন্তু কয়জনে দেখবে?
বাংলাদেশ টেলিভিশন ভিউয়ারস রেটিং সার্ভে অনুযায়ী প্রায় ৬৫ ভাগ পুরুষ টেলিভিশনে নিউজ দেখে। আবার মহিলাদের ৫ ভাগ ভিউয়ারসও নিউজ দেখেনা। তাঁরা দেখে নাটক, সিরিয়াল, সিনেমা, রান্নার অনুষ্ঠান, সাজসজ্জা ইত্যাদি। বাচ্চাদের ৯০ ভাগ কার্টুন দেখে। ইয়াং জেনারেশন দেখে খেলা, মিউজিক, ফিকশন মুভি ইত্যাদি। তাছাড়া বাংলাদেশে ইনডিয়ান টিভি’র জনপ্রিয়তা এখন সবচেয়ে বেশী। ইনডিয়ান চ্যানেল গুলো সবচাইতে পপুলার। বাংলাদেশে যে ফ্যামিলিতে টিভি আছে এবং ডিশ লাইন আছে সে বাসায় ইনডিয়ান টিভি দেখা হয়না এরকম কদাচিৎ পাওয়া যেতে পারে। তুমি চাইলে একটা সার্ভে করে দেখতে পারো, যাদের তুমি খুব পবিত্র মন নিয়ে শ্রদ্ধা কর, তাদের বাসায় বাচ্চারা টিভি তে কী অনুষ্ঠান দেখে? মেয়ে বা নারীরা কোন অনুষ্ঠান দেখে?
শরিয়ার মাণদণ্ডে একটি পুতঃ পবিত্র ইসলামিক টিভি অবশ্যই থাকতে হবে কিন্তু সেটাতো সীমিত একটা শ্রেণীকে কাভার করছে মাত্র। তুমি ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখবে, ইসলামিক টিভি’র প্রশ্নোত্তরের অনুষ্ঠানের চাইতেও এনটিভি বা এটিএন এর ইসলামী অনুষ্ঠানের দর্শকপ্রিয়তা বেশী। তাছাড়া একটি ইসলামিক টিভি আছে, তাদের নিজেদেরই কমারসিয়াল্লি টিকে থাকতে কষ্ট হচ্ছে, কারণ তাদের ভিউয়ারস মাত্র ২-৩ পারসেন্ট সেখানে আমারা গিয়ে নিজেরাও দুর্বল হবো তাদেরও দুর্বল করে ফেলবো।
তাঁর কথা গুলো আমি ইচ্ছা করে এড়িয়ে যাই, মাথায় ঢুকাতে চাইনা। আমি শুধু বললাম, সব ঠিক আছে কিন্তু আমদের সম্পৃক্ততায়, আমাদের হাত দিয়ে এটা হওয়া ঠিক হবেনা।
আমার কথায় তিনি কিছুটা বিরক্ত হলেও তা প্রকাশ করলেন না। তিনি বললেন, এতদিন শুনেছি তুমি খুব সাহসী।
- না আমি সাহসী নই, খুব ভীতূ। আপনি ভুল শুনেছেন।
- স্রোতের বিপরীতে চলার হিম্মত নাই তুমি কীসের মুজাহিদ? (আমি চুপ করে থাকি)
এবার তিনি বললেন, ‘জাহেলিয়াতের সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার যোগ্যতা সম্পন্ন কর্মী’ তো তুমি নিজেই হতে পারনাই । (আমি চুপ, কিছুক্ষণ তিনিও চুপ থেকে তারপর আবার শুরু করলেন)
তোমার সব কথা আমি মেনেনিলাম, কিন্তু তা সত্বেও এই কাজের সূত্রপাত কাউকে না কাউকে করতে হবে।
আমরা একসময় নির্বাচনী পোস্টারে প্রার্থীর ছবি ব্যবহার করতাম না। পরে যখন ব্যবহার শুরু করলাম বেশ সমলোচনা হলো। জায়েজ-নাজায়েজ প্রশ্ন উঠলো! আমরা কোন জবাব দিতাম না। সময়ের ব্যবধানে প্রশ্ন কমতে থাকে। এখন কেউ প্রশ্ন করেনা বরং সুন্দর ভালো ছবি ব্যবহার করার জন্য তাগাদা দেয়।
ছাত্রজীবন থেকে মেয়েদের সাথে কথা বলা, পরদা মেনে চলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কঠোর তত্ত্বাবধান ছিল। বহু ভাইদের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে। আমরা বলেছি নারী নেতৃত্ব হারাম। কিন্তু এখন আমরা যাদের সাথে এক জোট হয়ে এক টেবিলে বসে আন্দোলন করছি সেই জোটের নেতা একজন নারী। ঘণ্টার পর ঘণ্টার কর্মসূচি নিয়ে মুখোমুখি আলোচনা হচ্ছে। আমাদের ইফতার মাহফিলে সম্মানের সাথে প্রধান চেয়ারে বসিয়ে গুরুত্বের সাথে তাঁর বক্তব্য শুনছি আমরা। এগুলো নিয়ে এখনও প্রশ্ন হয়? আমরা জবাব দেই না এড়িয়ে যাই। শরিয়াত, হালাল, হারাম নিয়ে বিতর্ক যত কম করা যায় তত ভালো।
শরিয়াতে নামাজের জন্য অজু করা ফরজ। অজু করে মানুষ হাত, মুখ পরিষ্কার করে। কিন্তু যখন পানি পাওয়া না যায় তখন তায়াম্মুম করা নিয়ম। তায়াম্মুমে উল্টো হাতে মুখে ময়লা অর্থাৎ ধুলো বালি লাগে। তবুও তাতে পবিত্রতা হিসেবে ধরা হয়। শরিয়াত এর পাশাপাশি পরিবেশ, পরিস্থিতি, প্রেক্ষাপট ইসলামে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আমরাতো বলিনি বা বলছিনা আগে আমরা যা করেছি তা ভুল আর এখন যা করছি তা জায়েজ। মানুষ তাঁর নিজ নিজ জ্ঞান ও বিশ্লেষণ দিয়ে করণীয় ঠিক করবে, গ্রহণ করবে বা প্রত্যাখ্যান করবে। আমাদের শুধু খেয়াল রাখতে হবে আমাদের নিয়ত ও লক্ষ্য ঠিক আছে কীনা? নাকি আমরা স্রোতে বিলীন হয়ে যাচ্ছি!
তাই তোমাকে বলছি, কিছু প্রশ্ন সময়ের ব্যবধানে জবাব হয়ে যাবে। ফেইস করতে গেলে জটিলতা বাড়বে। তাই এভয়েড করা ভালো।
আমি নাছোড়বান্দা, তারপরও বললাম- টিসি, টিএস, আলোচনা সভা, এসব জায়গায় ভাইয়েরা প্রশ্ন করলে আমি কী বলবো?
- কিছুই বলবেনা।
- চুপ থাকবো?
- না বলবে ২ বছর পর্যন্ত এসব প্রশ্ন করা যাবেনা, ২ বছর পর দেখবে আর এসব প্রশ্ন করবেনা।
হটাত তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন তুমি কী নেতা হতে চাও?
আমি বললাম, আমিতো নেতা হয়েই আছি।
- ও আচ্ছা তাতো ঠিক বটে। যদি তুমি এই কাজে নিজেকে কুরবানী করতে চাও তাহলে নেতাগীরি বাদ দিয়ে কর্মী হয়ে যাও।
টিসি, টিএস, সভা-সমাবেশ, আলোচনা সভায় বক্তৃতা দেয়ার লোকের কী অভাব আছে? সবাই লোক গঠনের কাজ করলে, সভাপতি, আমীর, চেয়ারম্যান, এমপি হলে বিপ্লবের সহায়ক কাজগুলো কে করবে? তিনি বললেন, কামারুজ্জামান ভাই আমার সেক্রেটারি ছিল, মাওলানা তাহের আমার কর্মী, তাদের সাংগঠনিক দায়িত্ব ও পজিশন আমার উপরে। সো হোয়াট!
অনেকে অনেক কথা বলেছে আলহামদুলিল্লাহ্ আমার মনে কখনো কষ্ট অনুভুত হয়নি।
তুমি তোমার পথ দেখ- নিজের সুনাম, পরিচয়, দ্বিধা এসব ঝেড়ে ফেলে যদি অন্তরালে যেতে পারো। মিছিল সমাবেশে হাত তালি, পত্রিকায় ছবি ছাপা, টিসি, টিএস এর আবেগময় আলোচনা যদি সেক্রিফাইস করতে পারো তাহলেই কেবল তোমার পক্ষে নেতা থেকে কর্মী হওয়া সম্ভব.....! অসমাপ্ত...চলবে)
Comments
Post a Comment