মুখোশের বয়ান - ০১
#মুখোশের_বয়ান ••• (প্রথম অংশ)
মোটামুটি একটা ঝামেলায় পড়েছি।
বন্ধুদের কেউ কেউ খুব অসন্তুষ্ট।
আমি কেন মুভি দেখলাম, ফেসবুকে সেটার রিভিউ-ই বা লিখতে গেলাম কেন? এটা খুবই বেমানান, আমার মত লোকের সাথে এটা যায় কিনা! এটা আমার কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়... ইত্যাদি ইত্যাদি।
বন্ধুত্বের ভালোবাসা এবং অনুরাগ এমনই তো হওয়া উচিত। তারা আমার যে কাজে খুশী হবেন- বাহবা দেবেন। যেটা অপছন্দ করবেন, বেমানান মনে করবেন- তা খোলামেলা বলবেন।
কিন্তু আমার খারাপ লাগছে কেন?
আসলে সমলোচনা আমরা কেউ সহ্য করতে পারিনা। উপরে উপরে সুশীল, উদার, মুত্তাকি, মোহসেন ভাব নিয়ে থাকি। দিনশেষে আসলে আমি যে-ই সে-ই।
অতএব আমি আমার সে সব বন্ধুদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই যারা আমার ‘ডুব’ ও ‘ঢাকা এট্যাক’ সম্পর্কিত পোস্টে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
আমার সম্পর্কে আপনাদের উচ্চ নৈতিক ধারনার জন্য আমি অতিশয় কৃতজ্ঞ। কিন্তু বিশ্বাস করুন আপনারা যে ধারনা, বিশ্বাস ও প্রত্যাশা নিয়ে আমাকে দেখেন বা দেখতে চান সেটার যোগ্য আমি নই, কস্মিনকালেও ছিলাম না।
১৯৯১-৯২ সালে আমি তখন চট্টগ্রাম কলেজ ক্যম্পাস বিভাগে দায়িত্ব পালন করি। কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানে আমার লেখা একটি নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। নাটকের নাম দিয়েছিলাম ‘মুখোশ‘। নাটকের গল্পটা লিখতে গিয়ে আমি টের পেলাম বারবার আমার স্বরুপ আর মুখোশ টাই আমি লিখছি।
আসলে আমরা নিজের অজান্তে সবাই মুখোশ দেখতে পছন্দ করি। স্বরুপের আচ্ছাদন একটু বিমুক্ত হলেই শেষ। ছিঃ ছিঃ রিঃ রি....
আপনারা আজ যেভাবে বললেন সবকাজ সবাইকে মানায় না! এটা আপনার জন্য দৃষ্টিকটু!
বিশ্বাস করুন ছাত্র আন্দোলনের জীবনে প্রত্যেক ছত্রে ছত্রে একথা আমাকে হজম করতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ক্লাসে পড়া অবস্থায়, শীর্ষ দায়িত্বপালন কালে আমি যখন মাঠে ফুটবল, ক্রিকেট, টেবিল টেনিস, ক্যারম, ব্যডমিন্টন ইত্যাদি খেলতাম। ফ্যাকাল্টিতে মিছিলে হাত তালি দিয়ে প্যারডি গাইতাম তখন প্রত্যেক বৈঠকে আমার প্রতি কমন এহতেসাব থাকতো যে “এটা আমার করা উচিত নয়- বেমানান”!
কিন্তু আমার বেহায়া প্রবৃত্তি সাময়িক বাঁধ মানে ঠিকই পরক্ষণেই ধ্বসে পড়ে ফিতরাত বা স্বকীয়তার কাছে।
আমাকে অনেকে প্রশ্ন করে পারিবারিক এত বিরোধীতা মাড়িয়ে আপনি আন্দোলনে এতদূর সক্রিয় হয়েছিলেন কীভাবে? এর পেছনে বেশী অবদান কার?
আমি বলি ‘আমার পরিবারের’। তাদের নির্দয়, নির্মম, অযৌক্তিক বাঁধা আমাকে এই আন্দোলনে দৃঢ়ভাবে শামীল হতে প্রেরণা যুগিয়েছে।
২০০২ সালের বার্ষিক সম্মেলনে অনেকটা অকস্মাৎ আমার উপর অনাকাংখিত ভাবে সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব অর্পিত হয়। আমি তখন ঢাকা শহরতো দূরের কথা পল্টন থেকে কলাবাগানের রাস্তাটাও ভালো করে চিনতাম না। কী কারণে অত্যন্ত মেধাবী ও প্রতিশ্রুতিশীল আমার প্রিয় দায়িত্বশীল নজরুল ইসলাম (বর্তমানে ইউকে সিটিজেন ও বার-এট-ল) ভাইয়ের স্থলাভিসিক্ত আমাকে করা হয়েছিল তা এখনো আমার কাছে রহস্যাবৃত।
আমার স্পষ্ট মনে আছে সম্মেলন শেষে সবাইকে বিদায় দিতে দিতে অনেক রাত হয়ে যায়। বুলবুল ভাই গাড়ি বাদ দিয়ে আমাকে নিয়ে রিক্সায় চেপে বসলেন। সবাইতো অবাক! নতুন সিপি, সেক্রেটারি জেনারেল গাড়িতে না গিয়ে রিক্সায় যাবেন? বুলবুল ভাই কড়া ধমক দিয়ে কলাবাগান অভিমুখী সবাইকে গাড়িতে উঠতে বললেন। আমাদের রিক্সা শুনশান রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলছে। আমার ভেতর তখনো ঘোর। বুঝতে পারছি বুলবুল ভাই আমাকে কিছু বলতে চান- একা একা। গাড়িতে অন্যকেউ না থাকলেও ড্রাইভার তো থাকে, তাই সমস্যা। নিস্তব্ধ রাজপথ কোন সাড়া শব্দ নেই মাঝে মাঝে ট্রাকের বিচ্ছিরী গর্জন। রিক্সা চলতে চলতে কখন যে কাটাবনের কাছাকাছি চলে এসেছে খেয়ালই করিনি। বুলবুল ভাই তবুও চুপ, এরকম নীরবতা বার্তা দিচ্ছে তিনি এখন কঠিন কিছু কথা বলবেন। আমার খুব অস্বস্তি লাগছিল। তাঁকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ আমি আনমনে হেঁড়ে গলায় ফকির লালনের একটা গান গেয়ে উঠলাম, ও- যার আপন খবর আপনার হয় না.... একবার আপনারে চিনতে পারলে রে... যাবে অচেনারে চেনা.....!
বুলবুল ভাই খপ্ করে আমার বামহাতটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন- আহ্ এসব কী করেন! ছেলেমানুষী আপনার কখন যাবে?
প্রতি উত্তরে আমি বলেছিলাম, আমার ছেলেমানুষী কখনোই যাবেনা। আপনি আমাকে কেন এরকম একটা দায়িত্বে চিন্তা করলেন?
তিনি মিষ্টি করে ধমক দিয়ে বললেন- দায়িত্বে আমি চিন্তা করিনি সংগঠন চিন্তা করেছে। মনে রাখতে হবে আপনি এখন বড় দায়িত্বশীল। অতএব আপনাকে সতর্ক ও সাবধান হতে হবে। যা খুশী তা করা যাবেনা।
তাৎক্ষণিকভাবে আমার চোখে ভীষন কান্না এসে দমকে উঠলো,
আমি রিক্সার মধ্যে তাঁকে জাপটে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম- আমি পারবো না বুলবুল ভাই আমাকে মাফ করে দেন। তিনি আদরে আমার পীঠে হাত বুলিয়ে বলেছিলেন- না না আপনি পারবেন।
কিন্তু আমি পারিনি, সত্যিই পারিনি। আমার মুখোশ বারবার আলগা হয়েছ... (অসমাপ্ত)
( So Sorry, মুখোশের বয়ান অনেক লম্বা হয়ে যাচ্ছে, তাই অসমাপ্ত থাকলো, সময় পেলে বাকী কথা গুলো লিখবো)
Comments
Post a Comment