মুখোশের বয়ান - ০৬
#মুখোশের_বয়ান_ষষ্ঠ ...... (পূর্ববর্তী অংশের ধারাবাহিকতায়)
চিন্তা এবং দ্বিধা আমাকে জেঁকে ধরল।
মনে হচ্ছে বুকের উপর একটি পাহাড় ধ্বসে বসে আছে।
পরের দুদিন টানা সভা চললো বিশেষজ্ঞ ওস্তাদ আলেমদের নিয়ে।
পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম দেশে ইসলামিক ভাবধারার টিভি অনুষ্ঠান, ছায়া ছবি নির্মাণের নানা উদাহরণ নিয়ে আলোচনা হয়। ইরান, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, কাতার, ইয়েমেন, মিশর ইত্যাদি দেশে তাঁরা কী করছে, কীভাবে করছে, ইত্যাদি।
সভায় একজন ছিলেন মদীনা থেকে পিএইচডি করা, অসাধারণ মেধাবী। মিউজিক সম্পর্কে অভূতপূর্ব কিছু রেফারেন্স উল্লেখ করে তিনি বললেন, ইরান, মালয়েশিয়া, মিশর এসব দেশের ইসলামিক স্কলাররা মিউজিক ব্যাবহার কে বৈধ ঘোষণা করেছে। তাদের গবেষনা ও দলিলগুলো অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য। এদের বড় বড় সামাজিক অনুষ্ঠানে ইসলামিক কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয় এবং এগুলো খুবই জনপ্রিয়।
একজন বললেন, আপনারা ইরানের পলিসি ফলো করতে পারেন। ইরানী মুভিতে মেয়েরা মাথায় হিজাব পড়ে।
একেএম হানিফ ভাই বললেন, ইরানের সুবিধা হল তাঁরা যা করেছে তা রাষ্ট্রীয় ভাবে করেছে। ইরানের একটা রাষ্ট্রীয় ড্রেস কোড আছে। সেখানে নারীদের সবাইকে হিজাব পড়তে হয়। ইরানী ছবিতে যে মেয়েটাকে ভালো চরিত্রে দেখানো হচ্ছে অর্থাৎ নায়িকা সেও হিজাব পড়ে। আর যে মেয়েটাকে খারাপ বা বাজে ছেলেদের সাথে নাইট ক্লাবে যাওয়ার চরিত্রে দেখানো হচ্ছে সেও হিজাব পড়ে। এটা নিয়ে কোন কনফিউশন হয়না। কিন্তু আমাদের দেশে মাথায় হিজাব পড়ে মেয়েরা নাইট ক্লাব বা ব্রোথেলে যাচ্ছে এরকম যদি দেখাই তাহলে তা হবে খুবই সমস্যার। আপনারাই ফতওয়া দিয়ে বলবেন এখানে হিজাব কে অবমাননা করা হয়েছে। তাছাড়া এটা হবে একটা উলটা মেসেজ। পর্দা রক্ষা করতে গিয়ে বরং আমরা অন্য খারাপ মেসেজ দিয়ে বসবো। সবাই হানিফ ভাইয়ের কথায় সায় দেন।
আলেমদের মধ্যে যিনি খুব সম্মানিত তিনি কিছু কথা বলতে চাইলেন, আমরা সবাই তাঁর দিকে মনযোগী হলাম।
তিনি বললেন, আপনারা ইসলামী ধাঁচের টিভি করতে চাননা, এর পেছনে আপনাদের যুক্তি হোল ইসলামিক টিভি দিয়ে মূল জনগনের কাছে পৌঁছানো যাবেনা। ইসলাম প্রাকটিসিং লোকেরাই মূলতঃ ইসলামিক টিভি’র ভিউয়ার। যেহেতু একটা ইসলামী টিভি আছে এবং সামাজিক ভাবে মূলধারার মানুষের কাছে ইসলামী টিভি’র কদর ও কমার্শিয়াল ভেলু কম তাই আপনারা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছতে একটি মেইনস্টিম টিভি করতে চান। কিন্তু আপনারা যে টিভি করতে চাচ্ছেন সেটাতো অন্যগুলোর মতই। অন্য এতগুলো থাকতে একই রকম আরেকটা টিভি করে কী লাভ? আপনারা কীভাবে সাড়া ফেলবেন! আর আপনাদেরটা লোকেরা দেখবেই বা কেন?
আমি ভেবেছিলাম এত বড় বড় লোকদের সামনে কথা বলবনা, কিন্তু মুরুব্বির কথার জবাবে মুখ ফসকে কথা বেরিয়ে গেলো।
- জী মাওলানা, আমরা চিন্তা করেছি আমরা মূলধারার টিভি হবো ঠিকই কিন্তু আমাদের নিউজ, উপস্থাপনা, প্রোগ্রাম, টেকনোলজি বেশ কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই ভিন্নতা থাকবে। মানুষ যেন বুঝতে পারে এরা ডিফারেন্ট। যত দিন যাবে সেটা আরও স্পষ্ট হবে।
তিনি হাঁসতে হাঁসতে বললেন, বাগাড়াম্বর করে লাভ নাই দুই-একটা শুনাও তোমাদের বৈশিষ্ট যেইটা অন্যদের থেকে পৃথক হবে।
মাওলানার জেরায় আমি মনে মনে একটু নার্ভাস হলেও পরক্ষনে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম। আমাদের মেয়ে প্রেজেন্টারেরা মাথায় হিজাব পড়ে নিউজ পড়বে, যেটা বাংলাদেশের অন্য কোন চ্যানেলে করেনা। আমরা নিউজ শুরু করবো আসসালামুয়ালাইকুম দিয়ে শেষ করবো আল্লাহ হাফেজ দিয়ে। আমরা পাঁচ ওয়াক্ত আজান প্রচার করবো, কোন প্রাইভেট চ্যানেল সেটা করেনা। আমরা আধুনিক ভিজ-আরটি গ্রাফিক্স, এনিমেশন ইউজ করে লাইভ নিউজ করবো। আমাদের সেটআপ গেটআপ এবং টীম সম্পূর্ণ আধুনিক ও নতুন। ১১০ জন নতুন সংবাদ পাঠক, রিপোর্টার, প্রোডিউসার এবং কলাকুশলী আমরা এই সেক্টরে উপস্থাপন করতে যাচ্ছি। অন্য টেলিভিশন নিজেরা অনুষ্ঠান খুব কম বানায় বাজার থেকে প্রকিউর করেই চ্যানেল চালায়। আর আমরা প্রকিউর কম করবো নিজেরা বানাবো বেশী...।
- থামো থামো! আর বলতে হবেনা, বলে তিনি আমাকে থামিয়ে দিলেন। আলহামদুলিল্লাহ্ বুঝা যাচ্ছে তোমরা নিজেদের একটা পৃথক আইডেন্টিটি নিয়ে আসতে চাচ্ছো। এটা বিরাট সাহসের ব্যাপার। দোয়া করি তোমরা যাতে সফল হও। কিন্তু এবার আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি শোন, তোমরা যেভাবে মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত থেকে সংস্কার বা পরিবর্তনের কাজ করতে চাচ্ছো এটা রাসুল(সঃ)এরও কর্মপন্থা ছিল।
রাসুল(সঃ) নিজেও মূলধারায় সম্পৃক্ত ছিলেন।
এটা তাঁর সুন্নাহ। নবুওাতের পূর্বে ৪০ বছর তিনি জাহেলী সমাজের মধ্যেই বিচরন করেছেন। তিনি সমাজ থেকে আইসোলোটেড(বিচ্ছ
িন্ন) ছিলেননা। সেজন্য কুফরি সমাজই তাঁকে আল-আমীন, আস- সাদিক উপাধি দিয়েছিল। নবুওয়াত প্রাপ্তির পর ১৩ বছর তিনি সেই জাহেলী সমাজে থেকেই তাদের সংশোধনের কাজ করেছেন। তাঁর জীবন শংকায় নিপতিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি মক্কা ছেড়ে যাননাই। কিন্তু কথা হল তৎকালীন সমাজের মধ্যে শক্তিশালী ভাবে থেকেও সমাজের সব খারাপী বা পংকিলতা থেকে তিনি মুক্ত ছিলেন। তিনি তাদের মধ্যে থেকেই কাজ করেছেন কিন্তু তিনি এবং তাঁর সাথীরা ছিল সকল জাহেলিয়াত থেকে মুক্ত।
হুজুর একটু গলা পরিস্কার করে বললেন, কিন্তু তোমরা যে মূলধারায় কাজ করার চিন্তা করছো সেখানে তো তোমরা সেই জাহেলিয়াতকে ধারন বা স্পর্শ করেই করতে চাচ্ছো? রাসুল(সঃ)এর কর্মকৌশল এর সাথে এখানেই তোমাদের পার্থক্য।
শ্রদ্ধেয় মাওলানার ছুঁড়ে দেয়া প্রশ্ন সবার মধ্যে চিন্তার ঢেউ খেলে দেয়। তিনি কী বুঝাতে চাইছেন সবার কাছে তা পরিষ্কার! আলোচনার কঠিন স্তরে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা। কারও কোন কথা নেই।
আমতা আমতা করে বললাম, আমি কী একটু কথা বলতে পারি?
সবাই মাথা নেড়ে সাঁয় দিল।
আমার গলা কাঁপছিল। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, মক্কী জীবনে রাসুল (সঃ) যখন তাদের মাঝে মিলে মিশে সমাজ পরিবর্তনের কাজ শুরু করলেন হালাল, হারাম, জায়েজ, নাজায়েজ এসকল বিধান কী তখন জারী হয়েছিল? আমরা যে বলছি তাঁকে বা তাঁর সাথীদের পংকিলতা স্পর্শ করেনি, এই পংকিলতা মানে কী?
এই পংকিলতা মানে কী হালাল, হারাম?
একজন বললেন, এই পংকিলতা মানে পাপ বা অন্যায়, যা সেই জাহেলী সমাজেও মূল্যায়ন করা হত।
- কিন্তু এখন আমরাতো পাপ-পুণ্য বা ন্যায় অন্যায় কে বিবেচনায় আনছিনা। আনছি হালাল হারাম কে।
-মানে?
- ধরুন ঢাকার কোন রাস্তায় কিংবা মক্কা শহরের কোন এভেনিউতে কলেজগামী একটি ছাত্রী রোড এক্সিডেন্ট করলো, পাশে একজন ইয়াং পুলিস সার্জেন্ট কর্তব্যরত ছিল সে দৌড়ে এসে অন্যদের সহযোগিতায় ধরাধরি করে মেয়েটিকে এ্যাম্বুলেন্সে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেলো। আমাদের প্রচলিত সেকুলার সোসাইটি বা রাসুল (সঃ) এর তৎকালীন জাহেলী সমাজের দৃষ্টিতে এই কাজটি একটি জনহিতকর কাজ, উত্তম কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু শরিয়ার দৃষ্টিতে ঘটনাটার বিশ্লেষণ কী হবে?
প্রশ্ন আসবে বেগানা একটি পুরুষ বেগানা একজন নারীকে এভাবে সহযোগিতা করা জায়েজ হয়েছে কি না?
আমরা যদি এই ঘটনাটিকে ভিজুয়ালি দৃশ্যায়ন করতে চাই তাহলে প্রশ্ন আসবে বেগানা একটি মেয়ে এবং বেগানা একটি পুরুষের সাথে এই অভিনয় করানো শরিয়াত সম্মত হয়েছে কিনা?...।—(অসমাপ্ত ......চলবে)
Comments
Post a Comment